সম্প্রতি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির কক্সবাজার জেলা শাখার একটি স্মরণিকায় বর্তমান সরকারের জুলুমের শিকার হয়ে শাহাদাত বরনকারী নেতৃবৃন্দের উপর একটি লেখা দেয়ার জন্য আমাকে অনুরোধ করে। তাদের অনুরোধের প্রেক্ষিতেই আমার এ নাতিদীর্ঘ লেখা। তবে আমার পক্ষে তাদের অনুরোধ পুরোপুরি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। কেননা বর্তমান আওয়ামী সরকারের মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার হয়ে ফাঁসির মঞ্চে শাহাদাত বরণকারী নেতার সংখ্যা হলো পাঁচ জন। আর তারা হলেন- তৎকালীন আমীরে জামায়াত ও সাবেক মন্ত্রী শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারী জেনারেল ও সাবেক মন্ত্রী শহীদ আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য শহীদ মীর কাশেম আলী। তাছাড়া কারাগারে মিথ্যা মামলায় সাজা ভোগ করাকালে দুনিয়া থেকে চলে গেছেন সাবেক আমীরে জামায়াত ও ভাষা সৈনিক অধ্যাপক গোলাম আযম এবং সিনিয়র নায়েবে আমীর শাইখুল হাদিস মাওলানা এ.কে.এম ইউসুফ। স্মরনিকার এই ছোট কলবরে সাতজন শীর্ষ নেতার ঘটনাবহুল স্মৃতি তুলে ধরা সম্ভব নয় বিধায় মাত্র দুইজনের মধ্যে লিখাটি সীমাবদ্ধ রাখতে হচ্ছে।
আজ এমনই এক মুহুর্তে লেখাটি শুরু করেছি, যার কয়দিন পর আমাকেও জালিমের কারাগারে হয়তোবা বন্দী হতে হবে। কারণ ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী তথাকথিত আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল জনাব আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মিথ্যা স্বাক্ষীর উপর ভিত্তি করে সাজানো রায় প্রদানের দিন ধার্য করা হয়। সরকারের অসৎ উদ্দেশ্যের প্রতিবাদে ৪ ফেব্রুয়ারী বিক্ষুব্ধ জনতা রাজপথে নেমে পড়ে। মতিঝিলের শাপলা চত্ত্বরে জামায়াতে ইসলামী কর্তৃক আয়োজিত লাখো জনতার সমাবেশে আমার প্রদত্ত বক্তব্যের উপর আদালত অবমাননার মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়। এ অভিযোগের উপর ভিত্তিকরে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক আমাকে অন্যায়ভাবে তিন মাসের সাজা প্রদান করা হয়। সেই মামলায় আত্মসমর্পনের জন্য আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহন করেছি। এই প্রেক্ষাপটে আমার শ্রদ্ধেয় উক্ত সাতজন শীর্ষ নেতার উপর লেখার ইচ্ছা থাকলেও স্মরনিকার কলবর বিবেচনায় এনে আজ সংক্ষেপে দুইজন সাবেক আমীরে জামায়াতের স্মৃতিচারণ করে লেখাটি শেষ করছি। পরবর্তীতে সুযোগ হলে অবশিষ্ট নেতৃবৃন্দের স্মৃতি বিজড়িত লেখা নিয়ে কলম ধরবো, ইনশাল্লাহ্।
অধ্যাপক গোলাম আযম (১৯২২-২০১৪):
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী চিন্তাবিদ। ছাত্র জীবনে তিনি ছিলেন ভাষা সৈনিক ও ডাকসুর জি.এস। বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে তার রয়েছে অসামান্য অবদান। তিনি কেয়ারটেকার সরকারের রূপকার ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ। অত্যন্ত মেধাবী, প্রজ্ঞাবান ও অনেক গ্রন্থের প্রণেতা, সদালাপী, সাহসী, সৎ ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তিনি দেশে-বিদেশে সমাদৃত ও প্রসংশিত এক অপ্রতিদ্বন্দী নেতা। অধ্যাপক গোলাম আযম এক বিরল ব্যক্তিত্ব যিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে মানুষের মুক্তির জন্য ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি প্রায় ৩০ বছর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ছিলেন। তিনি শুধু বাংলাদেশেরই নন বরং বিশ^ ইসলামী আন্দোলনের জন্য এক মহাসম্পদ। ইসলাম বিরোধী শক্তি যখন বুঝতে পেরেছে স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে অধ্যাপক গোলাম আযমের সমসাময়িক কোন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি তাঁর রাজনৈতিক আদর্শকে মোকাবেলা করার অবস্থানে নেই। তাঁর মত একজন উচ্চমানের ইসলামী চিন্তাবিদ ও অপ্রতিদ্বন্দী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্ব দিলে এ দলটি সারাদেশে জনপ্রিয় ও শক্তিশালী দলে পরিণত হবে। এর ফলে জনগণ জামায়াতের উপর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করবে এবং এদেশে ইসলামী শক্তির বিজয় হবে। মুলত: এই কারনে তাঁকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য ষড়যন্ত্রমূলকভাবে যুদ্ধাপরাধের মিথ্যা অভিযোগ এনে কুৎসিৎ অপপ্রচার চালিয়ে বিতর্কিত করা হয়। অবশেষে বাংলাদেশের এ প্রাণপুরুষকে একটি মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে পিজি হাসপাতালের প্রিজন সেলে এক হাজার ১৬ দিন বিনা বিচারে আটক রাখা হয়। সেই প্রিজন সেলেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
অধ্যাপক গোলাম আযম বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলন ও রাজনৈতিক ইতিহাসে একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ ছিলেন। ছাত্র জীবন থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও প্রতিভাবান। বিভিন্ন পরীক্ষায় তিনি সেই মেধার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তিনি এস.এস.সি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় ১৩ তম এবং এইচ.এস.সি পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে ১০ম স্থান অধিকার করেন। তিনি ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার ডিগ্রী লাভ করেন। ছাত্র জীবনে বৃটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে রয়েছে তাঁর গৌরবোজ্জল ভূমিকা। ছাত্র জীবন শেষে তিনি ১৯৫০-৫৫ সাল পর্যন্ত রংপুর কারমাইকেল কলেজে অধ্যাপনা করেন। তিনি ছিলেন ভাষা সৈনিক ও বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যূত্থান পর্যন্ত এই ২১ বছরের জীবনে প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং জনগণের দাবী-দাওয়া নিয়ে পরিচালিত আন্দোলনে শুধু যোগদান করা নয়, প্রথম সারির নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছেন। ঐ সময়েও তিনি জনগণের স্বার্থ আদায় ও স্বৈরাচার বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন করতে গিয়ে অসংখ্যবার কারাবরণ করেছেন। সারা জীবন জেল-জুলুম সহ্য করা সত্ত্বেও ৯২ বছর বয়সে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলন ও নীতি নৈতিকতার ব্যাপারে তিনি ছিলেন অটল। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আদর্শিক ও রাজনৈতিক কারণে তাঁর মতো একজন মেধাবী, সৎ, যোগ্য নেতা ও নিরাপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে জীবনের শেষ সময়েও তথাকথিত মানবতা বিরোধী অপরাধের মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০১২ সালের ১১ জানুয়ারী আওয়ামী লীগ সরকার তাঁকে গ্রেফতার করলে কারাগারে যাবার আগে জাতীয় উদ্দেশ্যে দেয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, “১৯৮০’র দশকে এবং ১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে এবং ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত কেয়ারটেকার সরকারের দাবিতে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে জামায়াত ও আওয়ামী লীগ যুগপৎ আন্দোলন করেছিল। সকল আন্দোলনকারী দলের লিয়াজোঁ কমিটি একত্রে বৈঠক করে কর্মসূচী ঠিক করতো। তখনতো কোনো দিন আওয়ামী লীগ জামায়াত নেতৃবৃন্দকে যুদ্ধাপরাধী মনে করেনি। ফেব্রুয়ারী ১৯৯১-এর নির্বাচনের পর সরকার গঠনের জন্য আওয়ামী লীগ জামায়াতের সহযোগিতা প্রার্থনা করে আমার নিকট ধরণা দিয়েছিল। আওয়ামী লীগের নেতা আমির হোসেন আমু সাহেব জামায়াতের সেক্রেটারী জেনারেল মুজাহিদ সাহেবের মাধ্যমে আমাকে মন্ত্রী বানাবার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। তখনও তো আওয়ামী লীগের মনে হয়নি যে, জামায়াতে ইসলামী যুদ্ধাপরাধী। পরবর্তীতে, আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী জামায়াতের সমর্থন লাভের আবদার নিয়ে যখন আমার সাথে সাক্ষাৎ করেন, তখনও তো তাদের দৃষ্টিতে জামায়াত নেতৃবৃন্দ ‘যুদ্ধাপরাধী’ ছিল না। আমি জীবনে চারবার জেলে গিয়েছি। জেল বা মৃত্যুকে আমি ভয় পাই না। আমি আল্লাহ ছাড়া কাউকেই ভয় পাই না। শহীদ হওয়ার জযবা নিয়েই ইসলামী আন্দোলনে শরিক হয়েছি। মিথ্যা মামলায় ফাঁসি দিলে শহীদ হওয়ার মর্যাদা পাবো ইনশাল্লাহ্”। এ মজলুম জননেতার সাহসী ও দৃঢ় উচ্চারণ এখন এ দেশের ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের জন্য পথের দিশা।
অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে তথাকথিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ ছিল মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও সাজানো নাটক। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো তাঁর বিরুদ্ধে আনিত কোন অভিযোগ প্রমানিত না হওয়া সত্ত্বেও ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই তথাকথিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল- ১ তাঁকে প্রহসনমূলক বিচারের নামে ৯০ বছরের সাজা দেয়। যা আইনের শাসন ও মানবাধিকারকে দেশে-বিদেশে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। অবশেষে মিথ্যা সাজা ভোগ করা কালে ২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্টে এ প্রবীণ রাজনীতিবিদের জীবন অবসান হয়েছে। জালিমের কারাগারে এই মজলুমের শাহাদাত একটি অনন্য সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আর তা হলো ব্যক্তির চেয়ে লাশ বেশী শক্তিশালী। শাহাদাতের পর অধ্যাপক গোলাম আযমের লাশ দেখার জন্য তাঁর মগবাজারের কাজী অফিস লেনের বাড়ীতে মানুষের ঢল এবং বায়তুল মোকাররমের নামাযে জানাযায় লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণ এই অমোঘ সত্য প্রতিষ্ঠিত করেছে যে মিথ্যার আবরণে সত্যকে চিরদিন ঢেকে রাখা যায় না। ইংরেজীতে একটি কথা আছে। সেটি হল, ণড়ঁ পধহ ভড়ড়ষ ংড়সব ঢ়বড়ঢ়ষব ভড়ৎ ংড়সবঃরসব, নঁঃ ুড়ঁ পধহ’ঃ ভড়ড়ষ ধষষ ঢ়বড়ঢ়ষব ভড়ৎ ধষষ ঃরসব. অর্থাৎ আপনি কিছু সময়ের জন্য কিছু লোককে বোকা বানাতে পারেন, কিন্তু সব লোককে সব সময়ের জন্য বোকা বানাতে পারেন না। মানুষের চেতনা জাগ্রত হবেই। জামায়াতে ইসলামী এবং অধ্যাপক গোলাম আযম সম্পর্কে তেমনি এক তরফা সুসংগঠিত বৈরী প্রচারণা দ্বারা কিছু সংখ্যক মানুষকে কিছু সময়ের জন্য বিভ্রান্ত করা গিয়েছে। কিন্তু সব মানুষকে সব সময়ের জন্য বিভ্রান্ত করা যায়নি। গোলাম আযম সাহেব মৃত্যুবরণ করে সেই অমোঘ সত্যকে আরেকবার প্রতিষ্ঠিত করলেন।
অধ্যাপক গোলাম আযম একজন তাকওয়াবান ও উন্নত নৈতিকতা সম্পন্ন মানুষ ছিলেন। তাঁর চারিত্রিক যাদুর প্রভাবে তিনি মানুষের হৃদয় ও সত্যকে জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বিরোধীরাও তাঁর সান্ধিধ্যে এসে বন্ধুত্বে পরিণত হতেন। ঢাকার মিরপুরের অধিবাসী মনসুর আহমদ ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৯৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর আওয়ামী সরকারের পতনের দাবীতে যুগপৎ আন্দোলনের সময় সচিবালয় ঘেরাও চলাকালে আমি পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে মিরপুরে একটি হাসপাতালে ভর্তি হই। হাসপাতালে যতদিন ছিলাম মনসুর সাহেব নিজের বাসা থেকে আমার জন্য খাবার নিয়ে আসতেন। সাথে স্কুল পড়ুয়া নাতি মুজাহিদুল ইসলামও আসত। এই মুজাহিদ হলো ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোাবর পল্টন মোড়ে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের লগি-বৈঠার তান্ডবের নৃশংস দিবসের প্রথম শহীদ। একদিন হাসপাতালে দুপুরের খাবার সময় বীর মুক্তিযোদ্ধা মনসুর ভাই গর্ব করে বলছিলেন, আমি কিন্তু গোলাম আযম সাহেবের জালে আটকা পড়া জামায়াত কর্মী। এক সময় প্রচন্ড জামায়াত বিরোধী ছিলাম। কারণ আমার দুই ভাই মুক্তিযুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেছেন। আমি তাঁর পরিবর্তনের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এক জুমার দিন আমি গেলাম আযম সাহেবকে দেখার জন্য মগবাজার কাজী অফিস মসজিদে নামাজ আদায় করতে যাই। যে লোকটি এত মানুষকে খুন করেছে বলে পত্র পত্রিকায় দেখি তাকে দেখতে মন চাইল। এরপর মসজিদের মিন্বরে অধ্যাপক গোলাম আযম যখন খুতবা দিতে দাঁড়ালেন, তখন আমি তাঁর নুরানী চেহারার দিকে তাকাতেই আকৃষ্ট হয়ে যাই। মনযোগ দিয়ে উনার লিখিত খুতবা শুনলাম। তখন আমি হতবাক হলাম যে, একজন ইংরেজী শিক্ষিত লোক কুরআন হাদীসের উপর কতটা দক্ষ হলে এভাবে নিজের তৈরী করা খুতবা দিতে পারেন? মুহুর্তের মধ্যেই আমার মনের মাঝে পুঞ্জিভূত দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা পরিবর্তন হতে থাকে। ভাবতে থাকি এই লোক আর যাই করুক মানবতাবিরোধী অপরাধ করতে পারেন না। তার বিরুদ্ধে যা বলা হচ্ছে তা কাল্পনিক, ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। সেখান থেকে সিদ্ধান্ত নিই আমি জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিবো। মনসুর আহমদ ভাই পরে জামায়াতের রুকনও হয়েছেন।
মজলুম জননেতা অধ্যাপক গোলাম আযম নিজেই একটি আন্দোলন ও একটি ইতিহাস। তিনি প্রেরণা ও বিশ্বাসের স্মৃতির মিনার হয়ে আমাদের মাঝে আজো দন্ডায়মান। ছাত্র জীবন থেকে তিনি আমার অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। আমি ১৯৭৮ সালে প্রথম তাঁর নাম শুনি। ঐ সময়ে চট্টগ্রামের চুনতির মাহফিলে তাঁকে প্রথমবার স্ব-শরীরে দেখেছি। দেখেই মনে হয়েছিল তিনি অনেক উঁচু মানের মানুষ। সাদাসিদে লেবাস, নুরানী চেহারা দেখে ও জ্ঞান-গর্ভ আলোচনা শুনে আমি অনুপ্রাণিত হই। সেখান থেকেই আমি ইসলামী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনের প্রেরণা অনুভব করি। পরবর্তীকালে ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের চট্টগ্রামের শাখাগুলোর সদস্যদের একটি যৌথসভায় আমার অংশগ্রহনের সৌভাগ্য হয়। ঐ প্রোগ্রামে তিনি প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত হন। স্থানটি ছিল চট্টগ্রাম ষ্টেশন মসজিদের দি¦তীয় তলায়। ছাত্রশিবিরের সদস্যদের এ যৌথ সভায় তাঁর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আমার মনে রেখাপাত করে, যা আজো আমার চিন্তার জগতকে আলোড়িত করে। সেই দিনের সভায় তিনি বলেছিলেন, ইসলামী ছাত্রশিবির হলো নেতৃত্ব তৈরির সংগঠন। এই দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হলে নেতৃত্বের পরিবর্তন অপরিহার্য্য। এ লক্ষ্যে ইসলামী আন্দোলন, রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে কাংখিত মানের নেতৃত্ব তৈরি ও সরবরাহ করতে হবে ইসলামী ছাত্রশিবিরকে। দেশে এখন সৎ ও যোগ্য লোকের বড় অভাব। একটি আদর্শবাদী ছাত্র সংগঠন হিসেবে ইসলামী ছাত্রশিবিরই একদল সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব উপহার দিয়ে আগামী দিনে জাতির প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে। আজকে যারা ইসলামী ছাত্রশিবিরের তরুণ-যুবক তাদের লক্ষ্য রাখতে হবে যারা কেবল আত্ম-প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত, তারা দেশের সম্পদ নয়, তারা দেশের আপদ। তাই শিবিরের নেতা কর্মীদেরকে দেশের সম্পদ হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের যে সংকট রয়েছে তা দূর করতে হবে। ছাত্রশিবিরের প্রোগ্রামে আসলে তাঁকে প্রায় আমি এ কথাগুলো বলতে শুনেছি। ফলে শিবির এখন সেক্টরভিত্তিক লোক তৈরীকে অগ্রাধিকার দিয়ে লক্ষ্যপানে এগিয়ে যাচ্ছে।
অধ্যাপক গোলাম আযম একজন অকুতভয় ও দুঃসাহসী মানুষের নাম। তিনি ইসলামী আন্দোলনের জন্য কাজ করতে গিয়ে কখনো আল্লাহ্ ছাড়া কোন শক্তিকে ভয় পাননি। প্রতিকূল অবস্থায়ও নির্ভয়ে কাজ করেছেন। একজন সাহসী মানুষ হিসেবে তাঁকে আমি কাছ থেকে দেখেছি। ১৯৯৫ সালে মগবাজার আল-ফালাহ্ মিলনায়তনে শিবিরের সারা দেশের দায়িত্বশীলদের এক প্রোগ্রামে তাঁর উপস্থিত থাকার কথা। কিন্তু সে দিন ছিল হরতাল। আমার আশংকা হলো হরতালে গাড়ী চলাচল না করা ও নিরাপত্তার কারনে হয়তো তিনি প্রোগ্রামে আসতে পারবেন না। কারণ আল ফালাহ মিলনায়তন থেকে উনার বাসা একটু দূরে। হরতালে তাঁর মত আলোচিত ব্যক্তির জন্য রাস্তায় চলাচল করা ছিল বড় ঝুঁকিপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জের বিষয়। এদিকে ডেলিগেট ভাইয়েরা উনাকে দেখার জন্য বারবার অনুরোধ করছিল। এমন সময় টেলিফোন বেজে উঠল। ফোন রিসিভ করে দেখি আমীরে জামায়াত নিজেই ফোন করে বললেন, তোমরা লোক পাঠাও আমি যাবো এবং পায়ে হেটেই যাবো, ইনশাল্লাহ্। একথা শোনার পর আমি কয়েকজন ভাইকে সাথে নিয়ে নিজেই রওয়ানা হলাম। আল-ফালাহ্ ভবন থেকে নেমে ওয়ারলেস রেলক্রসিং ও সামনের মেইন রোড পার হয়ে তাঁর কাজী অফিস লেনস্থ বাসার সামনে দেখি উনি নীচে অপেক্ষা করছেন। অত:পর তাঁকে সাথে নিয়ে আমরা আল ফালাহর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। সেদিন এই বীর পুরুষের সাহসিকতা দেখে আমি আশ্চর্য হয়েছি। কারন আমি আতংকে ছিলাম, না জানি পথে কি ঘটে যায়? কিন্তু হরতালের উত্তপ্ত পরিবেশে তাঁর মাঝে কোন ধরণের চিন্তা বা উষ্মা দেখিনি বরং একজন যুবকের মত বীর দর্পে যেভাবে হেটে আল-ফালাহ্ মিলনায়তনে আসলেন এতে তাঁর মাঝে ঈমানী দৃঢ়তা লক্ষ্য করেছি। আসলেই তিনি একজন অত্যন্ত দৃঢ়চেতা, সাহসী এবং উন্নতমানের ঈমানী শক্তির অধিকারী মানুষ ছিলেন। হরতালের সময় সাধারণ মানুষ বাহিরে বের হতে ভয় পায়। আর সেই সময়ে একজন শীর্ষ নেতৃত্বের স্বাভাবিক চলাফেরা অস্বাভাবিক নয় কি? কিন্তু তাঁর সাহসের কাছে সব কিছু পরাজিত হয়েছে।
আল্লাহর পথে এই মুজাহিদের আরেকটি দু:সাহসিক ঘটনা আমি প্রত্যক্ষভাবে দেখেছি চট্টগ্রামে ১৯৯৪ সালের ২৬ জুলাই চট্টগ্রাম লালদীঘির ময়দানে জামায়াতে ইসলামীর জনসভার দিন। জনসভার প্রধান অতিথি হিসাবে তৎকালীন আমীরে জামায়াত ও মজলুম জননেতা অধ্যাপক গোলাম আযমের নাম ঘোষণার পর তথাকথিত ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি এ জনসভা প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়। ফলে চট্টগ্রাম শহরে চরম উত্তেজনা তৈরী হয়। ইসলাম বিরোধী শক্তির অন্যায় ও অগণতান্ত্রিক ঘোষণায় পিছু না হটে জামায়াত জনসভা সফল করার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। ঢাকা থেকে আমি এবং শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা ভাই জনসভার আগের রাতে তাঁকে নিয়ে চট্টগ্রামের এই দীর্ঘ পথ একসাথে পাড়ি দিয়েছি। কিন্তু তাঁর মাঝে কোন ধরণের উদ্বিগ্নতা লক্ষ্য করিনি। সকাল বেলা চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছে দেখি মানুষে মনে এক অজানা ভীতি কাজ করছে। জনসভাস্থলে কি না ঘটে যায়। দুপুরে যথাসময়ে জনসভা শুরু হয়। পড়ন্ত বিকালে প্রধান অতিথির বক্তব্য চলাকালে ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাসীরা সভা পন্ড করার জন্য অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে আক্রমন করে। তাদের স্বশস্ত্র আক্রমনে পুলিশ যখন আইন শৃংখলা রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তখন জামায়াতে ইসলামীর স্বেচ্ছাসেবকগণ আক্রমন প্রতিহত করার জন্য অগ্রসর হয়। তাদের উপর সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া গুলি চালালে জামায়াতের ২ জন ভাই গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদাত বরণ করেন এবং কয়েক জন কর্মী গুরুতর আহত হন। এই কঠিন মুহুর্তেও তিনি অকুতোভয় সৈনিকের মতো জনসভার মঞ্চে দাড়িয়ে নির্বিঘ্নে বিরামহীন বক্তব্য রেখেছেন। পরবর্তীতে যারা এ জনসভার বক্তৃতার অডিও শুনেছেন তারা ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে বলেছেন, বক্তৃতার প্রতিটি শব্দের সাথে একটি করে বুলেটের আওয়াজ ভেসে এসেছে। আসলে এরকম অবস্থা স্ব-চক্ষে না দেখলে বর্ণনা দিয়ে বোঝানো যাবে না। ইসলামী আন্দোলনের ময়দানে তিনি একই সাহসিকতার সাথে সারা জীবন অতিবাহিত করেছেন। এমন কি জীবনের শেষ মুহুর্তেও আপসহীন ভূমিকা পালন করে এই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। প্রসঙ্গক্রমে সেই দিনের জনসভার আরেকটি ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা মনে পড়ে গেল। ঘটনাটি হলো জনসভা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুর মুহুর্তে প্রচন্ড ভিড়ের মাঝে একজন বৃদ্ধলোক চিৎকার করে বলে উঠলো বাবারা আমি অনেক দূরের গ্রাম থেকে এসেছি “গোলাম আযমকে” একনজর দেখার জন্য। তোমরা আমাকে সাহায্য কর। সে আবার কোন ধরণের মানুষ আমি স্বচক্ষে দেখতে চাই। জনসভার স্বেচ্ছাসেবকগণ শহীদ কামরুজ্জামান ভাইয়ের লেখা “সংগ্রামী জননেতা অধ্যাপক গোলাম” আযম বইটি বৃদ্ধের হাতে দিয়ে বলল চাচা উনি এখনো মঞ্চে পৌছাননি। আপনি বইয়ের কভারের এই ছবিটি দেখুন। বৃদ্ধ লোকটি সাথে সাথে বলে উঠলেন এটি তাঁর ছবি নয়। আমি আমার গ্রামের একটি পোষ্টারে দেখেছি গোলাম আযমের মাথায় শিং আছে এবং লম্বা লম্বা দাঁত আছে। স্বেচ্ছাসেবকদের বুঝতে আর দেরী হলনা যে, এই বৃদ্ধ ইসলাম বিরোধীদের অপপ্রচারের শিকার হয়েছেন। ভিড়ের মধ্যে তাকে মঞ্চের কাছাকাছি নিয়ে বসানো হল। কিছুক্ষণ পর অধ্যাপক গোলাম আযম মঞ্চে উপস্থিত হলে একজন স্বেচ্ছাসেবক বৃদ্ধ লোকটিকে আঙ্গুলের ইশারায় আমীরে জামায়াতকে দেখালেন। দেখার সাথে সাথে বৃদ্ধ চোখের পানি মুছতে মুছতে বইয়েরর কভারের ছবিতে চুমু খেতে খেতে বলে উঠলেন হায় আল্লাহ্ এমন একজন বুজর্গ লোককে শয়তানরা দেশ থেকে বের করে দিতে চায়? তাহলে আমাদের এদেশে থেকে কি লাভ? না তা হতে পারে না একথা বলে বৃদ্ধ লোকটি তাকবির ধ্বনি ও শ্লোগান দিতে থাকেন। এভাবে সেদিনও সত্যের কাছে মিথ্যার পরাজয় ঘটেছিল।
আমার জীবনের আরেকটি ছোট ঘটনা এখানে বলার লোভ সামলাতে পারছিনা। ছাত্র জীবন শেষ হওয়ার পর আমার বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হলে আমি দুপুরবেলা দাওয়াত এবং দোআ নিতে উনার বাসায় গিয়েছিলাম। বিয়ের কথা শুনে তিনি বললেন, তোমার বিয়ের দাওয়াত থেকে আমি বেশি খুশি হয়েছি এ জন্য যে, তুমি জামায়াতের রুকন হয়েছ। আসলে একজন দায়িত্বশীল তার অধ:স্তন জনশক্তির মানোন্নয়নের মাঝে যে আনন্দ পান তা এই কথার মাধ্যমে ফুটে উঠে। ছাত্র জীবন শেষ করে দ্রুত রুকন হওয়াটাই তাঁর কাছে বেশি আনন্দের ছিল। তিনি ছাত্র সংগঠন থেকে বিদায়ীদের কাছ থেকে সব সময় এটাই কামনা করতেন। ছাত্র জীবন শেষ করে যারা দায়িত্ব পালন করতো তাদের তিনি বেশি খোঁজ খবর নিতেন, পরামর্শ দিতেন। শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি ডেকে এনে যেভাবে কথা বলতেন, পরামর্শ দিতেন, খোঁজ খবর নিতেন আসলেই তা অবাক হওয়ার মতো। সত্যিকারের একজন যোগ্য নেতার এই বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের অনূপ্রেরণা দিত। ২০০৮ সালের নির্বাচনে কক্সবাজার- ২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর আমি তাঁর কাছে দোআ নিতে গিয়েছিলাম। আমাকে দেখে তিনি অত্যন্ত খুশি মনে আল্লাহপাকের শুকরিয়া আদায় করেন এবং সংসদে গঠনমূলক ভূমিকা রাখার পরামর্শ দেন। এক কথায় বলতে গেলে সব দিকে তিনি দৃষ্টি রাখতেন। একজন আদর্শবাদী দলের নেতা ও বিজ্ঞ রাজনীতিবীদ হিসেবে তাঁর দলের ভূমিকা এবং দলকে কোন পর্যায়ে পৌঁছাতে হবে তা নিয়ে তিনি সব সময় চিন্তা করতেন।
অধ্যাপক গোলাম আযম ব্যক্তি জীবনেও অত্যন্ত ভারসম্যপূর্ণ ছিলেন। তিনি সময়ানুবর্তি, স্বাস্থ্যসচেতন ও নিয়মানুবর্তি এককথায় একজন সুশৃংখল মানুষ ছিলেন। সফরের সময়ও এর ব্যতিক্রম ঘটতোনা। স্বাস্থ্য সচেতনার ব্যাপারে তিনি এতটাই সজাগ থাকতেন যে, সফরের বৈরি পরিবেশেও তিনি রুটিন মাফিক জীবন যাপন করতেন। খাওয়া, ঘুমানো, গোসল ও সালাত তিনি সময় মত আদায় করতেন। সময়ের ব্যাপারে তিনি এতটাই সচেতন ছিলেন, প্রোগ্রাম শুরু হওয়ার আগেই উপস্থিত হতেন। সকল ক্ষেত্রে তাঁর সময় সচেতনতা দেখে মনে হয় ঘড়ির কাঁটার সাথে তাঁর জীবন পরিচালিত হতো। এমনই একটি বিরল ঘটনা আমি তাঁর জীবনে দেখেছি। একবার চট্টগ্রামের ফয়েজ লেকে জামায়াতে ইসলামীর এক প্রোগ্রামে দুপুরের খাবারের পর একটা গাছের ছায়ার নীচে কাপড়ের ঘেরার মধ্যে বিছানায় উপর শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। অর্থ্যাৎ খোলা মাঠেও তিনি দুপুরের খাবার পর আধা ঘন্টা বিশ্রাম নেয়ার প্রতিদিনের রুটিন মেনে চলার ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। সকল ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একজন আদর্শ মানুষ। আবার একজন আল্লাহ ওয়ালা ব্যক্তি হিসেবে অধ্যাপক গোলাম আযম ছিলেন সর্বস্তরের জনশক্তির কাছে অনুপ্রেরণা স্বরূপ। সফরের সময় প্রোগ্রাম শেষ করে ক্লান্ত শরীরে আমরা যখন রাত্রি বেলা ঘুমে বিভোর তখন তিনি শেষ রাতে উঠে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতেন। ব্যস্ততার কারনে যতই দেরিতে ঘুমান না কেন, শেষ রাতে উঠে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করাও তাঁর প্রতিদিনের রুটিন ছিল। এভাবে ইসলামী আন্দোলনের এ শ্রদ্ধেয় নেতা মহান আল্লাহ্র সাথে তিনি গভীর সম্পর্ক রক্ষা করতেন।
অধ্যাপক গোলাম আযম মানুষ হিসেবে যেমন সফল তেমনি দ্বীনের দা’ঈ হিসাবে তাঁর সাফল্য অনবদ্য। তিনি পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইসলামী আন্দোলনের শিকড়কে শুধু অত্যন্ত গভীরেই প্রোথিত করেননি, এর অবস্থানকে দৃঢ় এবং মজবুত করেছেন। সহজবোধ্য ভাষায় তাঁর লিখিত ছোট-বড় দেড় শতাধিক বই অনন্তকাল ধরে ইসলামী আন্দোলনের প্রামান্য দলিল হয়ে থাকবে। তাঁর দাওয়াত পেয়ে, বক্তৃতা শুনে, প্রনীত ও অনুদিত সাহিত্য পড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ ইসলামী জীবন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তার সকল অবদান কবুল করুন, আমীন॥
২০১১ সালে আমি ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকা অবস্থায় একদিন সকালে দেখি জেল সুপারের নেতৃত্বে ২৬নং সেলের একটা রুম পরিষ্কার করা হচ্ছে। পরে খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারলাম অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেবকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং এখানে আনা হবে। শুনে মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল। এই বয়সে তিনি কিভাবে কারাগারে জীবন-যাপন করবেন? তিনিতো অন্যের সহযোগিতা ছাড়া চলাফেরা করতে পারেন না। তবে দুঃখের মাঝেও লোভ হচ্ছিল কারাগারে তাঁর মতো নেককার মানুষের সান্নিধ্য লাভ ও খেদমত করার সুযোগ পাবো। পরে শুনতে পেলাম সরকার অজানা কারণে তাঁকে এখানে না এনে পিজি হাসপাতালের প্রিজন সেলে পাঠিয়ে দেয়। এখানে তিনি দীর্ঘদিন বন্দী থেকে বৃদ্ধ বয়সে অনেক কষ্টে ধুকে ধুকে একাকি জীবন কাটিয়েছেন। ইমাম ইবনে তাইমিয়ার মত এ বর্ষীয়ান নেতা জালিমের কারাগারে ২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর রাত ১০টা ১০ মিনিটে বাংলাদেশ ও বিশে^র বিভিন্ন দেশের অগনিত মানুষকে কাঁদিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর বিদায়ের পর জাতি বুঝতে পেরেছে অধ্যাপক গোলাম আযম অনেক বড় মাপের মানুষ ছিলেন। বায়তুল মোকাররম মসজিদে লাখ মানুষের ঢল, সকল পেশা ও শ্রেনীর মানুষের উপস্থিতিই প্রমাণ করে তিনি কতটা জনপ্রিয় ছিলেন। একজন সফল ও আদর্শ নেতা হিসাবে তিনি মানুষের মনের গভীরে স্থান করে নিয়েছিলেন। তাঁর জানাযায় সর্বস্তরের মানুষের এই উপস্থিতি প্রমাণ করে তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পুর্ন মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। এই মিথ্যাচারের জবাব জাতি তাঁর জানাযার মাধ্যমে দিয়েছে। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর বর্ণাঢ্য জীবন আমাদের প্রেরণার উৎস। তাই নামাজে জানাযার পূর্ব মুহুর্তে তাঁর চতুর্থ পুত্র অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আল-আযমী যথার্থই বলেছেন, “আপনারা অধ্যাপক গোলাম আযমকে ভালবাসেন না, আপনারা ভালবাসেন সত্য দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য একনিষ্ঠভাবে নিবেদিত একজন কর্মী গোলাম আযমকে। তাঁর বিদায় মানে ইসলামী আন্দোলনের বিদায় নয়। এদেশে আরো লাখো লাখো গোলাম আযম তৈরী হবে ইনশাল্লাহ, যারা একদিন এ দেশের মাটিতে ইসলামের বিজয় পতাকা উড়াবে। ইসলামকে বিজয়ী করবে”। উল্লেখ্য, সফল পিতার সাহসী পুত্র আযমীর সেই দিনের বক্তব্য ইসলাম প্রিয় জনতাকে উজ্জ্বীবিত করেছে। কিন্তু ইসলাম বিরোধী শক্তির জন্য এটি গাত্রদাহ হয়েছে। এ কারণে জালিম সরকার তাঁকে অন্যায়ভাবে রাতের অন্ধকারে বাড়ী থেকে ধরে নিয়ে গুম করে ফেলে। আজো তার কোন সন্ধান নেই। মহান আল্লাহ্ যেন তাঁকে নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়, আমরা সেই দোয়া করছি।
ইসলামের মর্দ্দে মুজাহিদ অধ্যাপক গোলাম আযম শহীদ হওয়ার জজবা নিয়ে ইসলামী আন্দোলনে শরীক হয়েছিলেন। মৃত্যুর পূর্বমুহুর্ত পর্যন্ত শাহাদাতের বাসনা নিয়ে আল্লাহর কাছে কাছে পাড়ি জমিয়েছেন। হযরত সহল বিন হানিফ থেকে বর্ণিত হয়েছে- রাসুল (সঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি খালেস অন্ত:করণে আল্লাহর কাছে শাহাদাতের বাসনা করে, সে ব্যক্তি বিছানায় মারা গেলেও আল্লাহ তাকে শহীদের মর্যাদা দিবেন। অধ্যাপক গোলাম আযম সেই মর্যাদায় ভূষিত হবে, ইনশাল্লাহ্। মহান আল্লাহপাক তাঁর সকল নেক আমল ও ত্যাগ তীতিক্ষার প্রতিদানের পাশাপাশি শহীদি মর্যাদা দিয়ে তাঁকে জান্নাতের উত্তম মেহমান হিসেবে কবুল করুন, আমিন। তাঁর পথ ধরে আমরা যেন চলতে পারি এবং রেখে যাওয়া কাজ নিষ্ঠার সাথে আঞ্জাম দিতে পারি, আজকের এই দিনে মহান আল্লাহর কাছে এই প্রার্থনা করি।
মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী (১৯৪৩-২০১৬):
জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী এবং অধ্যাপক গোলাম আযমের সাহচার্য পেয়ে বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের পরবর্তী কান্ডারী হিসেবে যিনি তৈরী হয়েছিলেন তিনি হলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী। তিনি একই সময়ে সংগঠনের আমীর এবং বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। তিনি দু’বার পাবনা জেলার সাঁথিয়া-ভেড়া থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৯১ সালে জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের নেতা ছিলেন। ছাত্রজীবনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের প্রাদেশিক সভাপতি এবং পরবর্তীতে নিখিল পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসাবে ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন বিশ^নন্দিত ইসলামী আন্দোলনের নেতা ও দেশ বরেণ্য শীর্ষস্থানীয় আলেমে দ্বীন। সেই সাথে একজন জননন্দিত জননেতা, দক্ষ সংগঠক ও সমাজ সেবক। অত্যন্ত অমায়িক, মার্জিত রুচিবোধের অধিকারী মাওলানা নিজামীর জীবন ছিল সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও সাদাসিধে। সংগঠনের প্রতিটি নেতা-কর্মী ও অফিসে কর্মরত প্রতিটি মানুষকে তিনি ভীষণ ভালবাসতেন। কারাগারে বসে লিখা বইয়ে তিনি সেই স্মৃতি এভাবে তুলে ধরেন- “আমি আমার প্রিয় সংগঠনের নেতা-কর্মীদের প্রাণের চেয়েও বেশী ভালবাসী। এই ভালবাসায় কোন কৃত্রিমতা নেই। অফিসের সাথে সম্পৃক্ত ছোট-বড় দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত ব্যক্তিদের যেমন ভালবাসি, তেমনি ভালবাসী আমার প্রিয় সংগঠনের অফিসকে। অফিসের প্রতিটি আসবাসপত্র, ইট-পাথর-ধূলাবালি সবই আমার কাছে একান্ত প্রিয়, যার সাথে আমার আত্মা গভীর ও নিবিরভাবে জড়িয়ে আছে অকৃত্রিম মায়া মমতায়”।
মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী এদেশের রাজনীতি ও ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। ছাত্র জীবন থেকেই তিনি প্রখর মেধাবীর অধিকারী ছিলেন। মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন পরীক্ষায় তিনি স্বীয় মেধা ও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। ১৯৫৫ সালের মেধা তালিকায় স্থানসহ প্রথম শ্রেণীতে দাখিল পাশ, ১৯৫৯ সালে মেধা তালিকায় ১৭তম স্থান দখল করে আলিম, ১৯৬১ সালে প্রথম শ্রেণীতে ফাজিল এবং ১৯৬৩ সালে মাদ্রাসা-ই-আলীয়া ঢাকা থেকে ফেকাহ শাস্ত্রে কামিল পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন। প্রখর মেধার অধিকারী মাওলানা নিজামী ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। ছাত্র জীবনেও তিনি সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য ছাত্রনেতা ছিলেন। দল মত নির্বিশেষে সকল ছাত্রদের বিপদে-আপদে তিনি সহযোগিতা করার চেষ্টা করতেন। ১৯৬৯ সালের স্বৈরাচার আয়ূব বিরোধী আন্দোলনে নিহত বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের কর্মী আসাদ নিহত হয়। আদর্শিক বৈপরিত্য সত্ত্বেও তিনি আসাদের জানাযায় উপস্থিত হন। জানাযায় উপস্থিত ছাত্র নেতৃবৃন্দের অনুরোধে মাওলানা নিজামী আসাদের জানাযায় ইমামতি করেন। এতেই বুঝা যায় তিনি সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য ও সম্মানের পাত্র ছিলেন। দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামে মাওলানা নিজামীর অগ্রণী ভূমিকা যুগ যুগ ধরে মানুষ স্মরণ করবে। ইসলামী শিক্ষা আন্দোলন, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন আন্দোলন, টিপাইমূখ বাঁধ প্রতিরোধ আন্দোলনসহ গণমানুষের বিভিন্ন আন্দোলনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি ছিলেন সামনের কাতারে। এ কারণে নানা জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন মাওলানা নিজামী। তার জীবন নাশের চেষ্টাও করা হয়েছিল বহুবার। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের মেহেরবানীতে তিনি মৃত্যুর মূখ থেকে বারবার জনগণের মাঝে ফিরে আসতে সক্ষম হন।
মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের নিকট একজন আদর্শ নেতা ছিলেন। ১৯৭৮ সালে ঢাকার হোটেল ইডেনে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় সাথী সম্মেলনে একজন ডেলিগেট হিসাবে আমি তাঁকে দূর থেকে প্রথম দেখেছি। সেই দিনের কোন স্মৃতি ভাল ভাবে মনে করতে না পারলেও ১৯৮৩ সালের কেন্দ্রীয় সদস্য সম্মেলনের শেষ দিবসে মহৎ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন এ যোগ্য নেতার সাহচার্য ও দোয়া নেয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। সম্মেলনের সমাপনি অধিবেশনে তাঁর জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য উপস্থিত সকলকে অনুপ্রাণিত করেছিল। জ্যোর্তিময় ও সুন্দর চেহারা, কথা বলার বাচন ভঙ্গী, শব্দ চয়ন, দৃঢ়তা, জ্ঞানের গভীরতা, তাকওয়া ও বলিষ্ঠতা সবদিক দিয়ে তিনি ছিলেন একজন আদর্শ মানুষী ও ইসলামী আন্দোলনের একজন যোগ্য নেতা। ছাত্র ইসলামী আন্দোলনের প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ মনযোগ। ছাত্র জীবনে আমি ঢাকা মহানগরী ও কেন্দ্রীয় সংগঠনের দায়িত্ব পালনকালে যখনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের কোন প্রোগ্রামের জন্য তাঁকে দাওয়াত দিয়েছি তিনি কোন সময় না করেননি বরং শত ব্যস্ততা সত্ত্বে¡ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রোগ্রামে তিনি উপস্থিত হতেন। মনে হতো শিবিরের প্রোগ্রামে উপস্থিত থাকাকে তিনি বেশি অগ্রাধিকার দিতেন। একজন অভিভাবকের ন্যায় ছাত্রশিবিরকে গাইড করতেন এবং সাহচার্য দিতেন। জামায়াতে ইসলামীতে আসার পর আমি তাঁকে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখেছি। রাজধানীর মিছিল-মিটিং গুলোত সামনে থেকেই নেতৃত্ব দিয়েছেন। সারাদেশে ইসলামী আন্দোলনের অগ্রযাত্রার পথে রয়েছে তাঁর অগ্রণী ভুমিকা। জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে অনেক যুলুম-নির্যাতন সহ্য করেছেন, কারা বরণ করেছেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় এবং প্রেসক্লাবে আক্রমনের শিকার হয়েছেন। বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে তার সাহসী ভূমিকা অপরিসীম। নানাবিধ যুলুম-নির্যাতনের মধ্যেও কখনো উৎকন্ঠা বা উদ্বেগ তাঁর মধ্যে লক্ষ্য করিনি। সব সময় আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করতেন। তিনি বলতেন, প্রতিকূল অবস্থা যখন আসে তখন আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়াই বিপদ মুছিবত থেকে মুমিনের পরিত্রাণ পাওয়ার প্রধান হাতিয়ার। ২০১১ সালে কারাগারে মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীসহ একসাথে বসে আমরা তাঁর কাছে একটি ঘটনা শুনে বিমুগ্ধ হয়েছি। ঘটনাটি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেবের নাগরিকত্ব পুনরুদ্ধারের জন্য যখন আন্দোলন চলছিল তখন আওয়ামী লীগের বঙ্গুবন্ধু এভিনিউর সমাবেশ থেকে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় অফিস জ্বালিয়ে দেয়ার ঘোষণা দেয়। সমাবেশ শেষে অস্ত্র শস্ত্র হাতে মিছিল নিয়ে তারা জামায়াতের মগবাজার অফিসের দিকে রওয়ানা দেয়। খবর পাওয়ার পর দ্রুত যোগাযোগ করে যাদেরকে পেয়েছি, তাদেরকে প্রস্তুত রেখে আমি অফিস রুমে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে দু’রাকাআত নামাজ আদায় করে আল্লাহপাকের কাছে দু’হাত তুলে মোনাজাত শুরু করি। কিছুক্ষন পর জানতে পারলাম তারা মিছিলের গতিপথ পরিবর্তন করে অন্য রোড দিয়ে চলে গেছে। এ ঘটনায় আমার মনে হলো মহান আল্লাহপাক তাদের অন্তরে ভীতি তৈরী করায় এ দিকে আসার সাহস তারা করেনি। প্রতিকূল পরিবেশে শত্রুর মোকাবেলায় আল্লাহর কাছে চাওয়াটাই মুমিনের মুখ্য হাতিয়ার, এটাই তিনি সেইদিনের ঘটনার মাধ্যমে আমাদেরকে বুঝাতে চেয়েছেন। তাছাড়া তিনি বিভিন্ন সভায় দোয়া সম্পর্কে বক্তব্য রাখার সময় যে হাদিসটি বেশী বলতেন, তা হলো “আদ-দোয়াউ সেলাহুল মু’মেনিন” অর্থাৎ দোয়া হলো মুমিনের হাতিয়ার।
২০০০ সালের ১৯ নভেম্বর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমীর নির্বাচিত হন। অতপর ২০০৬ সালে তৃতীয় বারের মত আমীর নির্বাচিত হয়ে শাহাদাতের পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত তিনি এই মহান দায়িত্বে অধিষ্ঠিত ছিলেন। প্রথমবার আমীর নির্বাচিত হওয়ার পর জামায়াতের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বশীল নিযুক্তির জন্য তিনি সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ভাইদের সাথে পরামর্শ করছিলেন। তখন আমি ঢাকা মহানগরীর প্রচার সেক্রেটারী ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার নির্বাচিত সদস্য ছিলাম। একদা আমাকে কেন্দ্রীয় অফিস থেকে জানানো হয় বাদ মাগরিব আমীরে জামায়াতের সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে। সেই অনুযায়ী আমি কেন্দ্রীয় অফিস সংলগ্ন মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়ে আমীরে জামায়াত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী সাহেবের কক্ষে প্রবেশ করি। সালাম ও কূশল বিনিময়ের পর সাংগঠনিক বিষয়ে পরামর্শ চাইলে আমি তাঁকে আমীরে জামায়াত বলে সম্বোধন করে কথা শুরু করি। সাথে সাথে আমাকে থামিয়ে তিনি হেসে হেসে বললেন, “আমিতো তোমাদের নিজামী ভাই। এটিই আমার বেশী ভাল লাগে”। তাঁর কথায় মনে হল স্বাভাবগত কারণে এই মহান দায়িত্বপূর্ণ পবিত্র পদবীটি তার নামের সাথে শুনতে তিনি সংকোচবোধ করেছিলেন। তাছাড়া ছাত্র জীবন থেকেই সবাই যে তাঁকে নিজামী ভাই বলতেন এর মধ্যে তিনি আলাদা মায়া, ভাতৃত্ববোধ ও ভালবাসা অনুভব করতেন। নিজামী ভাই যখন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারী জেনারেল ছিলেন, তখন ঢাকা মহানগরী সংগঠনের তত্ত্বাবধানেরও দায়িত্বে ছিলেন। সাংগঠনিক কার্যক্রম ও জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মসূচী বাস্তবায়নের তাকে অত্যন্ত কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। সংগঠনের বড় কোন কর্মসূচী বাস্তবায়নে আমাদের সাথে মহানগরী অফিসে এসে খোঁজ খবর নিতেন। কখনো কখনো বৈঠক করে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিতেন। তিনি অত্যন্ত দক্ষ সংগঠক, বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও প্রজ্ঞাবান মানুষ ছিলেন। একজন সমাজসেবক ও মানবদরদী হিসাবেও তাকে দেখেছি সিডরের পর খুলনা, বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালী সফরে। সেই সফরেও তিনদিন আমি তার সাথে কাটিয়েছি। সিডর আক্রান্ত প্রতিটি জেলার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা তিনি প্রচন্ড রোদের মাঝে ঘুরে ঘুরে দেখেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে ত্রাণ সামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। পাশে গিয়ে শান্তনা দিয়েছেন হতাশাগস্ত অসহায় মানুষগুলোকে। শুধু তাই নয়, ঢাকায় ফিরে এসে সংবাদ সম্মেলন করে দূর্গত এলাকার বিপর্যস্ত চিত্র তুলে ধরেছেন এবং দেশের সরকার ও বিত্তবান লোকদের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানিয়েছিলেন। তাছাড়া নিজ দলের নেতা-কর্মীদেরকেও ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো ও ত্রাণ তৎপরতা চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। অতঃপর দলের সেক্রেটারী জেনারেল শহীদ আলী আহসান মুজাহিদকে বিপুল পরিমাণ ত্রাণ সামগ্রীসহ সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পাঠিয়েছিলেন। সৌভাগ্যক্রমে সেক্রেটারী জেনারেলের সাথে দ্বিতীয় দফা আমারও সিডর এলাকায় এাণ কাজে অংশ নেয়ার সুযোগ হয়েছিল। তিনিও কঠোর পরিশ্রম করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সহায়তা করেছিলেন।
দেশ, সংগঠন ও সংগঠনের ভাইদের ব্যাপারে সর্বদা সজাগ ছিলেন। জেলখানার ভেতরেও তিনি দেশের পরিস্থিতি, সাংগঠনিক বিষয়াদি ও সংগঠনের ভাই-বোনদের খোঁজ-খবর রাখতেন। আমি ২০১১ সালে কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করি। সেদিন কারা কর্তৃপক্ষের অফিসিয়াল ফরমালিটিস শেষ করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। মাগরিবের নামাজের পর একজন কারারক্ষী আমাকে ২৬নং সেলে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে দেখি আমীরে জামায়াত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী তাঁর কক্ষে বসে আছেন। জেলখানার সেবক তাঁকে নাস্তা পরিবেশনের জন্য এসেছে। আমাকে দেখে তিনি অবাক হলেন। সাথে সাথে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন কি হয়েছে? তুমি যে এখানে? এ প্রশ্নের পর সেবককে তাড়াতাড়ি সাঈদী সাহেবকে খবর দিতে বললেন। আমি পাশে বসে তাকে সবকিছু খুলে বললাম। সংগঠনের নায়েবে আমীর অধ্যাপক এ.কে.এম নাজির আহমদ ভাইসহ আমরা ১২ জন একটি মিথ্যা মামলায় উচ্চ আদালতের ৬ সপ্তাহের জামিনে ছিলাম। ঐদিন নিম্ন আদালতে হাজির হয়ে নিয়মিত জামিনের আবেদন করা হয়। বিচারক জামিনের আবেদন নাকচ করে আমাদেরকে সরকারের নির্দেশনায় জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়। নাজির ভাই-এর কথাশুনে তিনি বেশ চিন্তিত হলেন। শীতের দিনে এ বয়োবৃদ্ধ মানুষটির বেশ কষ্ট হবে। আরো যারা সাথে ছিলেন, তাদের ব্যাপারেও খোঁজ-খবর নিলেন। অত:পর তার সামনে যে নাস্তা আনা হয়েছিল তা আমাকে খেতে দিলেন। পেটে বেশ ক্ষুধা থাকলেও আমি বুঝতে পেরেছি এই ১পিচ সেন্ডুইচ আমি খেলে তাঁকে বিকালের নাস্তা না করে থাকতে হবে। বাসায় হলেতো নিজামী ভাবীর সেই টেবিলভরা আতিথেয়তা পাওয়া যেত। কিন্তু আমি খেতে না চাইলেও আমার কারাবন্দী নেতা বসা থেকে উঠে স্নেহভরা কন্ঠে বললেন আমি নিশ্চিত তুমি দুপুরে খাও নাই। এটি খেয়ে আপাতত ক্ষুধা নিবারণ করো। এশার নামাজের পর সকলে একসাথে রাতে খাবার খাব। এ কথা বলে নিজেই আমাকে খাইয়ে দিলেন। এতে মনে হলো, একজন শিশুর বাবার মত তিনি আমাকে আদর করে খাইয়ে দিচ্ছেন। জেলখানায় তাঁর এ স্নেহ-মমতা দেখে আমার চোখে পানি চলে এলো। এ সময়ে সংগঠনের অন্যতম নায়েবে আমীর ও প্রখ্যাত মুফাচ্ছিরে কুরআন মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী সাহেব আরো কয়েকজন ভিআইপি বন্দী সাথে নিয়ে প্রবেশ করলেন। এর মধ্যে রয়েছে সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, মেজর জেনারেল (অবঃ) রেজ্জাকুল হায়দার, ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) আবদুর রহীম, তিন সাবেক আইজিপি সর্বজনাব আশরাফুল হুদা, আশরাফুল হক, খুদা বক্স প্রমূখ। সকলেই কোলাকুলি এবং কূশল বিনিময়ের পর দেশের খবরা খবর জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে প্রশ্ন করতে থাকলেন। এ সময় নিজামী ভাই আবদুস সালাম পিন্টু সাহেবকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিনম্র কন্ঠে বললেন ম্যানেজার সাহেব ম্যাচেতো রাতের খাবার পাক হয়ে গেছে। এখন নতুন মেহমানের রাতের খাবারের ব্যবস্থা কি হবে? বিষয়টি নিয়ে পিন্টু সাহেব ভাবতে লাগলেন। এ সময় সাঈদী সাহেব বললেন ম্যাচে যে কয়জনের পাক আছে তাতে হাদিস অনুযায়ী আমল করলে একজনের খাবার সমস্যা হবার কথা নয়। এ কথায় উপস্থিত সবাই সম্মতি দিলেন। কিছুক্ষণ পর সকলে উঠে যার যার কক্ষে চলে গেলে নিজমাী ভাই ও সাঈদী সাহেব আমার থাকার জায়গা নিয়ে আলাপ শুরু করলেন। সেবককে দিয়ে রেজ্জাকুল হায়দার সাহেবকে খবর দিয়ে এনে নিজামী ভাই বিষয়টি উপস্থাপন করলেন। রেজ্জাকুল হায়দার সাহেব একজন অনুগত কর্মীর ন্যায় স্বত:স্ফুর্তভাবে বললেন স্যার আপনি চিন্তা করবেন না। আমার কক্ষে একটি খাট অতিরিক্ত আছে আমীরে জামায়াত সম্মত হলে আমি মেহমানকে নিয়ে যাবো। কারা অভ্যন্তরেও নিজামী ভাই সকলের নেতা এবং তার প্রতি সকলের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা দেখে সেইদিন আমি অবিভূত হয়েছি। রেজ্জাকুল হায়দার সাহেব আমাদের সামনে থেকে বেরিয়ে পূনরায় ফিরে এসে জানালেন নাট্যকার আবিদ রেজা চিকিৎসার জন্য কয়েকদিন ধরে বাহিরে আছেন। মেহমান ইচ্ছা করলে সেখানেও থাকতে পারবেন। অত:পর আমি সেই কক্ষেই ছোট ব্যাগটি নিয়ে প্রবেশ করে দেখি একজন সেবক বিছানা গুছানোর কাজ করছে। এ সময় নিজামী ভাই নিজের একখানা বিছানা চাদর নিয়ে এলেন। আর সাঈদী সাহেব নিয়ে এলেন গায়ে দেয়ার জন্য লাল টুকটুকে একটি কম্বল। এ সব দেখে ইতস্তত: করছিলাম। আমাকে স্বাভাবিক করার জন্য আমার দুই শ্রদ্ধেয় দায়িত্বশীল বললেন শীতের রাত এ গুলো নাও, নয়তো কষ্ট পাবে। আমাদের ব্যবহারের জন্য আরো আছে। সেই সময়ে কারাগারে যতদিন ছিলাম নেতৃবৃন্দসহ সকলের আন্তরিকতা ও সৌহার্দপূর্ণ ব্যবহারের কথা যখনই মনে পড়ে তখন মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে।
লালবাগের নাজিম উদ্দীন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারের ২৬নং ভিআইপি সেলে ছোট ছোট ১২টি কক্ষ ছিল। সামনে লম্বা একটি বারান্দা, পৃথক ভাউন্ডারীতে ঘেরা এই সেলের মধ্যে ছোট একটি মাঠ। এক পাশে পাকের ঘর। ঐ সময়ে সেখানে আমরা ১১ জন ছিলাম। মাঝে মধ্যে নাসির উদ্দীন পিন্টুকে কাশিমপুর থেকে আনা হতো কোর্টে মামলার শুনানীর তারিখগুলোতে। বারান্দার একপাশে ছিল নামাজের স্থান, অন্যপাশে ডাইনিং টেবিল এবং মাঝখানে সোফাসেট। সেখানে বসে সবাই পত্র-পত্রিকা পড়তেন। কারাগারে সাধারণত সন্ধ্যার পূর্বে লকআপ হওয়ার নিয়ম থাকলেও ভিআইপি সেলে লকআপ এশার পর রাতের খাবার সেরেই হতো। সেইদিন লকআপের পর বেশ দেরীতে আমার ঘুম আসে। আমার পাশের কক্ষে ছিলেন নিজামী ভাই। রাত ৩টার দিকে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। গভীর রাতে চারিদিকে নিরব-নিশব্দ পরিবেশ। এর মাঝে আমার কানে ভেসে আসে নিজামী ভাইয়ের কান্না বিজড়িত মোনাজাতের আওয়াজ। সুরা বাকারার ২৮৬নং আয়াতের শেষাংশ পড়ে তিনি মহান আল্লাহর কাছে দোআ করছেন, যার অর্থ- “হে আমাদের প্রতিপালক! যে বোঝা বহন করার সামর্থ্য আমাদের নেই, তা আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়ো না। আমাদের প্রতি কোমল হও, আমাদের অপরাধ ক্ষমা করো এবং আমাদের প্রতি করুণা করো। তুমি আমাদের অভিভাবক। কাফেরদের মোকাবিলায় তুমি আমাদের সাহায্য করো”। তিনি এ আয়াতটি বারবার উচ্চারণ করছেন আর কান্নাকাটি করে মহান আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করছেন। এ অবস্থায় আমি আর শুয়ে থাকতে পারলাম না। দ্রুত বিছানা থেকে উঠে ওজু করে নামাজে দাঁড়ালাম। ঘড়ির কাটায় যখন পৌনে ৪ টা বাজে তখন প্রতিটি কক্ষেই একই কান্নার আওয়াজ। সেই এক অন্য রকম দৃশ্য। সকলেই শেষ রাতে উঠে মহান প্রভূ ও আরশের মালিকের নিকট দু’ হাত তুলে দোয়া করছেন দেশ, জাতি, নিজেদের পরিবার পরিজন, আখেরাতে নাজাত, মাগফেরাত ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। পরবর্তী রাতগুলোর একই দৃশ্যের অবতারণা হতো ২৬নং সেলের অবরুদ্ধ কক্ষগুলোতে। প্রথম রাতের তাজাজ্জুদ নামাজ শেষে ফজর নামাজ ও কুরআন তেলায়াতের পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে ডাইনিং টেবিলে একত্র বসে সকালের নাস্তা করলাম। নাস্তা শেষে সাঈদী সাহেব তার কক্ষে নিয়ে একটি হাদিস গ্রন্থ আমার হাতে তুলে দিলেন। অত:পর বললেন আসর নামাজের পর এখানে দারস্ চালু ছিল। আপাতত তা বন্ধ রয়েছে। আপনাকে পেয়ে আজ থেকে দারসের প্রোগ্রামটি পুনরায় চালু করতে চাই। কারাবন্দীদের মাঝে দাওয়াতী কাজের এ সুযোগটি গ্রহণ করা প্রয়োজন। আমীরে জামায়াতও খুশী হবেন। এ বিষয়ে নির্দেশনা পাওয়ার পর কক্ষে ফিরে আমি সেদিনের প্রস্তুতি শুরু করলাম। যথারীতি আসর নামাজের পর দারসে হাদিস পেশ করলাম। শ্রোতাদের মনোযোগ দেখে নিজেও উৎসাহবোধ করলাম। তবে আমীরে জামায়াত ও আল্লামা সাঈদী সাহেবের মত ব্যক্তিবর্গ যখন শ্রোতা হন তখনতো বক্তার অবস্থা যে নাজুক তাতো সহজেই অনুমেয়। প্রতিদিনের দারসে উপস্থিত মুসল্লিগণ ছাড়া কর্তব্যরত কারারক্ষীগণ ভবনের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দারস্ শুনত। ২৬নং সেলে আমরা যতদিন ছিলাম সাঈদী সাহেব জুমার দিন খুৎবা দিতেন এবং জুমার নামাজে ইমামতি করতেন। ফরজ ছাড়া বাকী ওয়াক্তের জন্য একজন হাফেজ সাহেব কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত ইমাম ছিলেন। যিনি আমাদের মত কারাবন্দী মানুষ। রাত্রিবেলা তিনি সাধারণ বন্দীদের সাথে থাকতেন। শুনেছি পূর্বে হাদিসের শুধুমাত্র অনুবাদ করা হতো। আমি ব্যাখ্যাসহ পেশ করায় মনে হলো শ্রোতাদের শুনার আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ইমাম সাহেবের একটু অসুবিধা দেখা গেল। তাই একদিন ইমাম সাহেব তার সময়ের অসুবিধার কারণে আমীরে জামায়াতের মাধ্যমে দারস সংক্ষেপ করার জন্য আমাকে অনুরোধ জানালেন। ফলে আমি ইতোপূর্বে যেভাবে হাদিসের অনুবাদ পড়া হতো সেভাবে একটি হাদিস পাঠ করে শেষ করে দিলাম। সাবেক আইজিপি আশরাফুল হক সাহেব এতে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলে সাঈদী সাহেবসহ অনেকে তাকে সমর্থন যোগালেন। তখন আমীরে জামায়াত পূর্বের ন্যায় দারস্ পেশ করার জন্য নির্দেশ দিলে আমি পরদিন থেকে আবারো ব্যাখ্যাসহ দারস্ পেশ করতে থাকি। তখন থেকে মুক্তি লাভের দিন পর্যন্ত প্রায় আড়াই মাস আমি কারাগারে দ্বীনের খেদমত করতে পেরে মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম।
কারাবন্দীদের জন্য বাহিরের রান্না করা খাবার ভিতরে প্রবেশ করার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের নিষেধ আছে। কিন্তু ধর্মীয় ও জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে বাসা-বাড়ী থেকে রান্না করা খাবার পরিবারের সদস্যগণের মাধ্যমে সরবরাহ করার অনুমতি রয়েছে। এ সুযোগে ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে আমার বাসা থেকেও রান্না করা খাবার আসে। এতে মুরগীর গোশতও ছিল। প্রতিদিনের ন্যায় ঐদিন দুপুর বেলা ডাইনিং এ সবাই একসাথে খেতে বসলাম। খাবারের শেষ পর্যায়ে আমি নিজামী ভাইকে দু’টুকরা গোশত উঠিয়ে দিলাম। তিনি বললেন, আমার দাঁতের সমস্যার কারণে গোশত খেতে চাচ্ছি না। তখন আবদুস সালাম পিন্টু সাহেব বললেন, আপনার কর্মী রান্না করে পাঠিয়েছেন। না খেলেতো মনে কষ্ট পাবেন। এ কথা শুনার পর তিনি সাচ্ছন্দের সাথে খেতে খেতে মন্তব্য করলেন হামিদের বাসায় আগেও খেয়েছি। তার গিন্নি হরেক রকম রান্না করে এবং ভাল রাধুনীও বটে। আসল কথা হলো নিজামী ভাই একজন কর্মী বান্ধব নেতা। পিন্টু সাহেবের কথা শুনেই তিনি কর্মীকে খুশী করার জন্য দাঁতের কষ্ট সহ্য করে খেয়েছিলেন। কারাবন্দী অবস্থায় আমার আরেকটি সৌভাগ্যের বিষয় হলো আমীরে জামায়াত নিজামী ভাই ও নায়েবে আমীর মাওলানা সাঈদী সাহেবের সোহবত লাভ। সেখানে আমাদের নিয়ে আমীরে জামায়াত দেশের পরিস্থিত ও সাংগঠনিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতেন। একদিন সাংগঠনিক বিষয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে আমি আমীরে জামায়াতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললাম দেশের পরিস্থিতি যেদিকে যাক, জেলাখানা থেকে মুক্তি লাভের পর আপনি সংগঠনের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পা গ্রহণ করবেন। যাতে করে বৈশি^ক ও বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জামায়াত একটি ভিশন নির্ধারণ করে সামনে এগিয়ে যেতে পারে। তিনি প্রস্তাবের প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করে তখন বলেছিলেন তুমি কি মনে কর দেশের পরিস্থিতি পরিবর্তন না হলে আমরা জেল থেকে বের হতে পারবো? আমি বললাম ইনশাল্লাহ্, পরিবর্তন আসবে আপনি জনগণের মাঝে ফিরে যেতে পারবেন। মনের আশংকা ব্যক্ত করে তিনি বললেন আমিতো এরূপ সম্ভাবনা দেখছি না। তবে আমি মুক্তি না পেলেও পরবর্তীতে যারা দায়িত্বে আসবেন তাদের নিয়ে তোমরা এগিয়ে যাবে। আসলে শেষ পর্যন্ত তাই হয়েছে। তিনি আমাদের মাঝে আর ফিরে আসতে পারেন নি। জালিমের কারাগারে ফাঁসির মঞ্চে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করে মহান রবের দরবারে চলে গেছেন।
মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী চারদলীয় জোট সরকারের (২০০১-২০০৬) একজন সফল মন্ত্রী ছিলেন। এ সময়ে তিনি প্রথমে কৃষি এবং পরবর্তীতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী দুঃশাসনে দূর্নীতিগ্রস্ত এই দু’টি মন্ত্রণালয়কে পূর্নগঠন ও বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করে তিনি দেশ ও জাতির সেবায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী জাতীয় রাজনীতি ও সাংগঠনিক ব্যস্ততার মাঝেও নিজের নির্বাচনী এলাকা সাঁথিয়া-বেড়ার জনগণের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। জাতীয় সংসদের পাবনা-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন ও জনগণের সেবা করেছেন। মানুষের সেবা, উন্নয়ন ও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে তিনি এলাকার জনগনের মন জয় করতে পেরেছিলেন বলেই বার বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সাঁথিয়া-বেড়াবাসী তাঁকে কি পরিমান ভালবাসতো তা ভোটের ফলাফল দেখে বুঝা যায়। ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টাই তিনি নিজের এলাকার বাহিরে ছিলেন। তারপরও রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্যে তাঁর বিরুদ্ধে এলাকার জনগণের উপর অত্যাচার নির্যাতনের কাল্পনিক অভিযোগ আনা হয়। তবে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে যে সব এলাকার মানুষের উপর নির্যাতনের মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছিল সেই এলাকাগুলোতে তিনি অধিক ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। এ থেকেই বুঝা যায় তাঁর বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগগুলো মিথ্যা ও ভিত্তিহীন এবং জনগণ নির্বাচনে ব্যালটের মাধ্যমে এসব মিথ্যাচারের সঠিক জবাব দিয়েছিলেন। তিনি একজন ভাল বক্তা হিসাবে সমাদৃত ও প্রশংসিত। বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট, পল্টন ময়দানসহ সারাদেশের বিভিন্ন সমাবেশে তাঁর জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা জনগনকে আকৃষ্ট করতো। পার্লামেন্টেও তিনি বলিষ্ঠ ভুমিকা পালন করেছেন। দেশের পার্লামেন্টে সংসদ সদস্যগণ তাদের বক্তব্যে যেখানে আক্রমনাত্মক ও অশালীন ভাষা ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে উত্তপ্ত করতেন, তাঁর বিপরীতে মতিউর রহমান নিজামীর শান্ত-শিষ্ট, শালীন ও গঠনমূলক বক্তব্য সংসদের হাউজে আলোড়ন সৃষ্টি করত। তিনি যখন পার্লামেন্টে বক্তৃতা দিতেন তখন পিন পতন নিরবতা বিরাজ করতো। সরকারীদল ও বিরোধীদলের সাংসদগণ সকলেই তাঁর বক্তব্য মনযোগ সহকারে শ্রবণ করতো। তাঁর বক্তব্যের প্রতিটি লাইন, প্রতিটি বাক্যে চিন্তার খোরাক এবং জাতির জন্য দিক নির্দেশনা ছিল।
দেশের খ্যাতনামা আলেম-ওলামাদের মধ্যেও মতিউর রহমান নিজামী ভাইয়ের বিশাল গ্রহনযোগ্যতা ছিল। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব ও দেশ বরণ্য আলেমে দ্বীন মরহুম মাওলানা ওবায়দুল হক সাহেব তাঁর উস্তাদ ছিলেন। তিনি অত্যন্ত গর্ব করে বলতেন নিজামীর মত যোগ্য ছাত্র তৈরী করতে পেরে আমি আনন্দিত। যিনি আজ জাতিকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বাংলাদেশের আরেক শীর্ষ আলেমে দ্বীন ও মাসিক মদিনার সম্পাদক মরহুম মাওলানা মহিউদ্দিন খান। তিনি আমার আব্বার বন্ধু ছিলেন। তাই আমাকে ভাতিজা বলে ডাকতেন। আমি মাঝে মধ্যে উনার সাথে দেখা করতাম। তিনি প্রায় সময় বলতেন, জামায়াতের আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী একজন বড় মাপের আলেম ও বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার কথিত জঙ্গীবাদের নামে আলেম-ওলামা ও মাদ্রাসাগুলোতে ব্যাপক হয়রানি শুরু করে। নারীনীতি ও শিক্ষানীতি প্রণয়নের মাধ্যমে জনগণের ইসলামী চেতনা ও মূল্যবোধ ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। তখন একদিন সকালে তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা যায়নুল আবেদীন ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা জাফর উল্লাহ খানসহ আমরা কয়েকজন মাওলানা মহিউদ্দিন খান সাহেবের বাসায় গিয়েছিলাম। সকালের নাস্তার টেবিলে মাওলানা মহিউদ্দিন খান আমাদের নিকট দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার পর বললেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসলামপন্থীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া দেশ, ইসলাম ও জনগণের অধিকার রক্ষা করার কোন বিকল্প পথ নেই। তাই আপনারা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী সাহেবকে সরকারের ইসলাম বিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ইসলামপন্থীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য সোচ্চার হতে বলুন। আমিও সিদ্ধান্ত নিয়েছি দ্বীন ও ঈমান রক্ষার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে নিজে মাঠে থাকব, ইনশাল্লাহ্। এক সময় আমি জামায়াতের বিরোধীতা করতাম। কিন্তু এখন আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। এখন থেকে আপনারা যেভাবে চান আমাকে দ্বীনের কাজে লাগাতে পারেন। আমি জীবনের বাকী সময় জামায়াতের সাথে থেকেই দ্বীনের খেদমত করতে চাই”। এর কিছুদিন পর জাতীয় প্রেসক্লাবে মাওলানা মহিউদ্দিন খানের নেতৃত্বে ইসলামী দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত হয় সম্মিলিত উলামা-মাশায়েখ পরিষদ। এর মাধ্যমে শুরু হয় সরকারের ইসলাম বিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলন। যা পরবর্তীতে দেশব্যাপী হেফাজতে ইসলামের নাস্তিক-মুরতাদ বিরোধী ঈমানী আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়েছিল।
বর্তমান জালিম সরকারের ফাঁসির মঞ্চে আমীরে জামায়াতের শাহাদাতের সময় মাওলানা মহিউদ্দিন খান অসুস্থ্য হয়ে হাসপাতালে শায়িত ছিলেন। সেখানে নিজামী ভাইয়ের শাহাদাতের কথা শুনে চোখের পানি ছেড়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “আমীরে জামায়াত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী নিঃসন্দেহে আল্লাহ্র পথের একজন শহীদ। আমি স্বপ্নে দেখেছি একটি মাঠে অনেক আলেম-ওলামা সমাগম হয়েছে। আমি ভীড় ঠেলে সামনে গিয়ে দেখি আল্লাহর রাসূল (সা:) শুয়ে আছেন। আর তাঁর পাশেই সাদা জামা পরিহিত অত্যন্ত নূরানী চেহেরার একজন লোক বসে আছেন। লোকটিকে পরিচিত মনে হলে আমি ভালোভাবে তাকিয়ে দেখি। তখন দেখতে পেলাম আমাদের প্রিয় মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর পাশে বসে আছেন এবং রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) তাঁর মাথায় হাত বুলাচ্ছেন”। অত:পর খান সাহেব চোখ মুছতে মুছতে বললেন, এমন একজন প্রখ্যাত আলেম, নেককার ও পরিচ্ছন্ন মানুষকে বিচারের নামে সাজানো রায়ের মাধ্যমে তাঁরা শেষ পর্যন্ত ফাঁসি দিয়ে দিল? আল্লাহ তুমি এ জালিমের বিচার কর।
১১ মে, ২০১৬ সালের সেই বিভীষিকাময় রাতে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ১২টা ১০ মিনিটে এ পৃথিবী ছেড়ে মহান রবের সান্নিধ্যে চলে যান (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাহি রাজিউন)। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ফাঁসির কাষ্টে দাঁড়িয়ে তিনি আকাশের দিকে দু’হাত তুলে বলেছিলেন- আল্লাহ তুমি আমার শাহাদাত কবুল করো। জীবনের শেষ মুহুর্তেও শাহাদাতের কামনা ছিল তাঁর। মহান রাব্বুল আলামিনের ফায়সালার উপর সদা সন্তুষ্ট ও কৃতজ্ঞ ছিলেন। দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার আগে পরিবারের সদস্যদের সাথে শেষ সাক্ষাতের সময় সন্তানদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন- “আমার বয়স এখন ৭৫ বছর, আমার সহকর্মীদের অনেকেই আমার মত লম্বা হায়াত লাভ করে নাই। তোমরা তোমাদের বাবাকে দীর্ঘদিন পেয়েছ, হায়াত মাউত আল্লাহর হাতে, আমার মৃত্যু যদি আল্লাহ আজকে রাতেই লিখে রেখে থাকেন তাহলে বাসায় থাকলেও মৃত্যু হতো। সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখবে। আর শুকরিয়া আদায় করবে”। অত:পর তিনি সংগঠন, দেশ, দেশবাসীর সুখ-সমৃদ্ধি ও নিজের মাগফেরাতের জন্য পরিবারের সদস্যদের সাথে নিয়ে প্রায় ঘন্টাখানেক সময় দোয়া করেন। সেইসাথে সংগঠনের ভাইদের উদ্দেশ্যে দিক নির্দেশনামূলক বক্তব্য রেখে যান। তাঁর অনেকগুলো বক্তব্যের একটি হলো- “আমার এই শাহাদাত বাংলাদেশের জমীনকে ইসলামী আন্দোলনের জন্য উর্বর করবে”। আজ আমরা দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই তাঁর শাহাদাতের রক্ত বৃথা যাবে না, ইনশাআল্লাহ। শহীদদের রক্ত ঝরা এই জমীন ইসলামী আন্দোলনের জন্য উর্বর হবে এবং আগামী দিনে বাংলার জমীনে আল্লাহর দ্বীনের বিজয় আসবে, ইনশাআল্লাহ।
(লেখক- সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য ও সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী)










