চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের গভীরতা ক্রমেই কমে যাওয়ায় পোতাশ্রয়ে মাদার ভেসেল ও বড় কনটেইনার নোঙর করতে পারে না। ফলে বাংলাদেশ বৈদেশিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতির সাথে তাল মেলাতে পারছে না। দেশকে এই অর্থনৈতিক ক্ষতি থেকে বাঁচানোর জন্য চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। বেশ কয়েকটি স্থান জরিপের পর জাপানি প্রতিষ্ঠান ‘প্যাসিফিক কন্সালট্যান্ট ইন্টারন্যাশনাল’ কক্সবাজারের মহেশখালীর সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সুপারিশ করে। প্রস্তাবিত এই গভীর সমুদ্রবন্দরে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ জাহাজ প্রবেশ করতে পারবে। ফলে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর দক্ষিণ এশিয়ার সাথে আন্তর্জাতিক নৌপথগুলোর সংযোগ সাধন করে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। তা হলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার ব্যবসায়-বাণিজ্যের একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে এ অঞ্চলে প্রবেশদ্বার হবে। বন্দরটির ব্যবহার শুরু হলে পরিবহন ব্যয় কয়েক গুণ কমবে। এ ছাড়া বিপুল অঙ্কের বিদেশী বিনিয়োগ হবে। সারা দেশে ব্যবসায়-বাণিজ্যে গতি আসবে। কালক্রমে ব্যবসায়-বাণিজ্যের দিক থেকে বাংলাদেশ সিঙ্গাপুরের মতো গুরুত্ব পাবে। প্রতিবেশী দেশগুলো এই বন্দর ব্যবহার করলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে হবে লাভবান। বন্দরকে কেন্দ্র করে সে এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। অবকাঠামোগত ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হবে। কর্মসংস্থান ব্যাপকভাবে বাড়বে। আমদানি-রফতানি বাড়লে রাজস্ব আয়ও বাড়বে। তেল-গ্যাস ও অন্যান্য সমুদ্রসম্পদ আহরণ ও ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে। অন্য দিকে নিরাপত্তার প্রতি হুমকি দেখা দিলে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য বিকল্প নৌঘাঁটি হিসেবে বন্দরটি ব্যবহার করা যাবে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালের ২৬ আগস্ট ‘গভীর সমুদ্রবন্দর সেল’ নামে একটি সেল উদ্বোধন করা হয়। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে কাজ শুরু হয়ে ২০১৬ সাল নাগাদ প্রথমপর্যায়ের কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ব্যয় হয়েছে ১৪ কোটি টাকা। সময় লেগেছে ১২ বছর। গঠন করা হয়েছে একাধিক কমিটি। এই গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে বড় অঙ্কের বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে ছয়টি দেশ। কিন্তু সরকারের সিদ্ধান্তহীনতায় এখনো আলোর মুখ দেখেনি প্রকল্পটি।

সমুদ্রের পানির গভীরতার ভিন্নতার কারণেই চিরাচরিত বন্দর থেকে আলাদা করে নির্মিত বন্দর গভীর সমুদ্রবন্দর হচ্ছে। গভীর সমুদ্রবন্দর সাধারণত খুব বড় এবং অধিক লোডের জাহাজের ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়। গভীর সমুদ্রবন্দর হওয়ার পূর্বশর্তই হলো, সমুদ্রের পানির গভীরতা। চিরাচরিত বন্দরগুলোতে সমুদ্রের পানির গভীরতা সাধারণত ২০ ফুটের বেশি হয় না, যেখানে গভীর সমুদ্রবন্দরে এই গভীরতা ৩০ ফুটের চেয়েও বেশি হয়। চীনের সাংহাই গভীর সমুদ্রবন্দরে পানির গভীরতা ৬৬ ফুট, সিঙ্গাপুর গভীর সমুদ্রবন্দরে এই গভীরতা ৫৭ ফুট। এ ছাড়াও করাচি, হংকং, মেলবোর্ন গভীর সমুদ্রবন্দরগুলোয় পানির গভীরতা ৩০ ফুটের বেশি। তদুপরি একটি গভীর সমুদ্রবন্দরে জাহাজের নিরাপদ আশ্রয়, তেল ও গ্যাসের ট্র্যাক রেকর্ড, সমুদ্রের ওপরে নবায়নের সহযোগিতা, প্রিমিয়ার জাহাজের গন্তব্যস্থল, উন্নত যোগাযোগের সংযোগস্থল, দক্ষ শ্রমশক্তি, ২৪ ঘণ্টা অ্যাক্সেস ইত্যাদি সুবিধা বিদ্যমান থাকে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গভীর সমুদ্রবন্দর কত বেশি জরুরি, সেটা আমাদের নীতিনির্ধারকদের অজানা নয়। সিঙ্গাপুরের মতো দেশের আয়রোজগারের বড় একটি খাত হচ্ছে গভীর সমুদ্রবন্দর। তাত্ত্বিকভাবে সমুদ্রবন্দর হচ্ছে এমন একটি অর্থনৈতিক অবকাঠামো, যা একটি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে নানামুখী প্রভাব ফেলে। এটি রফতানিমুখী শিল্প গড়ে ওঠা, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আয় বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। একটি গভীর সমুদ্রবন্দর শুধু স্থানীয় বা জাতীয় নয়, আঞ্চলিক অর্থনীতির জন্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানই দেশটির জন্য এক বড় সুযোগের পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের এমন জায়গায়, যার আশপাশের দেশগুলোর অনেক অঞ্চল পুরোপুরি ভূমিবেষ্টিত, সমুদ্রের সান্নিধ্য নেই। বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি হলে ভারতের উত্তর-পূর্ব সাত রাজ্য, নেপাল, ভুটান, চীনের ইউনান বা মিয়ানমারের শান ও রাখাইন রাজ্য এর সুফল পেতে কাজে লাগাতে পারবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের গভীরতা কম থাকায় বড় জাহাজ প্রবেশ করতে পারে না। লাইটারেজের মাধ্যমে পণ্য গভীর সমুদ্র থেকে বন্দরে আনতে হয়। এ ছাড়া গভীর সমুদ্রবন্দর হলে পাশের দেশগুলোর বন্দরের সাথে সংযোগ স্থাপিত হবে। গভীরতা কম থাকায় বর্তমানে বিভিন্ন দেশের বড় জাহাজগুলো পোতাশ্রয়ে নোঙর করতে পারে না। তাই সিঙ্গাপুরে পণ্য খালাস করার পর সেটি ছোট জাহাজে করে বন্দরে আনা হয়। গভীর সমুদ্রবন্দরটি স্থাপিত হলে সরাসরি বড় জাহাজগুলো বন্দরে ভিড়তে পারবে। ফলে সময় ও পরিবহন খরচ অনেক কমে যাবে। এতে সবচেয়ে উপকারভোগী হবে দেশের তৈরী পোশাক শিল্পসহ রফতানি খাত। শুধু তাই নয়, গভীর সমুদ্রবন্দরের প্রথম পর্বের কাজ শেষ হলে দেশের অর্থনীতিতে ১.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে। আমদানি-রফতানি বাণিজ্যেও ১৮ থেকে ৩০ ভাগ পরিবহন ব্যয় কমে যাবে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে পণ্যমূল্যে। এ ছাড়াও যেকোনো দুর্যোগে জাহাজের দ্রুত আশ্রয় এবং ত্রাণবাহী জাহাজের নোঙরের জন্য গভীর সমুদ্রবন্দর প্রয়োজন।

বাংলাদেশে সর্বপ্রথম বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় ঐক্যজোট সরকার মহেশখালীর সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল। ওই সময় প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ৪৩ হাজার কোটি টাকা। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং প্রয়োজনীয় অর্থাভাবে কাজের অগ্রগতি হয়নি। পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার মহাজোট সরকার গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প নতুন করে হাতে নেয়। অবশেষে ২০০৯ সালে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য সম্ভাব্য জরিপ করে জাপানি প্রতিষ্ঠান Pacific Consultant International। এই জরিপে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, পানির ১৮ মিটার বা ৫৯ ফুট গভীরতা সবচেয়ে বড় জাহাজ ভেড়ার জন্য যথেষ্ট। এর ওপর ভিত্তি করে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীর সোনাদিয়া ও কুতুবদিয়া, চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ও সন্দ্বীপ এবং খুলনার আকরাম পয়েন্টসহ দেশের আটটি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছিল।

সব দিক বিবেচনা করে বর্তমান কক্সবাজার তথা বৃহত্তর চট্টগ্রামের সোনাদিয়াকে স্থান নির্বাচন করা হয়। এর পাশাপাশি মহেশখালীর মাতারবাড়ি, ধলঘাট, সোনাদিয়াসহ কক্সবাজার শহর, চকরিয়া ও রামু পর্যন্ত উপশহর (টাউনশিপ), ভারী শিল্প এলাকা, এলএনজি টার্মিনাল, মহেশখালী চ্যানেলে ঝুলন্ত সেতু, পর্যটন কেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দর ঘিরে বিশেষায়িত অর্থনৈতিক জোন গড়ে তোলা হবে। এ ছাড়া কুতুবদিয়াকে বন্দরের পোতাশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। সোনাদিয়া দ্বীপ গভীর সমুদ্রবন্দরের আড়াল হিসেবে ভূমিকা রাখবে। বর্তমান সরকার এই গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে। ‘ডিপ সি পোটর্ প্রজেক্ট’ নামে এ প্রকল্পটি তিন পর্বে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ২০১১ সালেই প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের ১৬ হাজার কোটি টাকার কাজ শুরু করার কথা ছিল এবং প্রথম পর্বের কাজ শেষ হলে (২০১৯ সাল নাগাদ শেষ হওয়ার কথা) ১১টি জেটি-বার্থের মাধ্যমে বন্দরের বাণিজ্যিক পরিচালনা চালু করা সম্ভব হবে। ২০২০ থেকে ২০৩৫ সাল মেয়াদি দ্বিতীয় পর্বের কাজ শুরু হলে বন্দরে যোগ হবে আরো ২৫টি জেটি-বার্থ। তৃতীয় পর্বের কাজ ২০৩৫ সালে শুরু হয়ে শেষ হবে ২০৫৫ সালে। বন্দরের কাজ সম্পূর্ণ শেষ হলে মোট জেটি-বার্থের সংখ্যা দাঁড়াবে ৯৬টিতে, যেখানে পোর্ট অব সিঙ্গাপুরের জেটি-বার্থ ৬৭টি। তখন গভীর সমুদ্রবন্দরে সর্বমোট ৯৬টি জাহাজ নোঙর করে একসাথে পণ্য ওঠানামা করা সম্ভব হবে। কিন্তু গত পাঁচ বছরেও তা শুরু করা হয়নি। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ৪ জুন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জাতীয় বাজেট বক্তৃতায় আটটি বড় প্রকল্পকে স্বল্পতম সময়ে বাস্তবায়িতব্য বা ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পের মধ্যে রেখেছেন। এর মধ্যে একটিÑ ‘সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প’, ‘অপরটি পায়রা সমুদ্রবন্দর প্রকল্প’। ইতোমধ্যে পায়রা সমুদ্রবন্দর নির্মাণকাজ শুরু হয়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। এ বিষয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, ‘২০১৮ সালের মধ্যে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় পায়রা সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম শেষ করে ২০২৩ সালে বন্দরটি পুরোপুরি চালু করা হবে। এ লক্ষ্য নিয়েই বন্দরের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।’ পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারায় পায়রা বন্দর নানা উপায়ে অবদান রাখতে পারে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, অনেক আগেই সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের মূল কাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এখন গোটা বিষয়টিই অনিশ্চয়তার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। এ কাজের মধ্যে রয়েছে মহেশখালী দ্বীপের সাথে রামু হয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক পর্যন্ত প্রশস্ত সড়ক যোগাযোগ এবং মহেশখালী থেকে দোহাজারী পর্যন্ত প্রায় ৭০ কিলোমিটার রেলপথ স্থাপন ও সড়ক যোগাযোগ, ৯টি জেটি নির্মাণ, ব্রেক ওয়াটার নির্মাণ, কনটেইনার ইয়ার্ড নির্মাণ, সিএসএফ নির্মাণ। কিন্তু সবই এখনো কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রয়েছে।

বাংলাদেশে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ আসলে ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে ভূরাজনীতির বিবেচনায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীন এককভাবেই সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে। বিকল্প হিসেবে তারা মোট প্রকল্প ব্যয়ের ৫১ শতাংশ অর্থ বিনিয়োগের কথা বলেছে। তবে বন্দর ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার দায়িত্ব তারা বাংলাদেশের সাথে যৌথভাবেই করবে। বাংলাদেশ অভিজ্ঞ ও দক্ষ কোনো তৃতীয় দেশকে এ দায়িত্ব দিতে চাইলে তাতেও আপত্তি নেই তাদের। তারা দ্রুত ডিটেইলস স্টাডি শেষে দু’বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ শুরু করার পক্ষে। ২০১৪ সালে সব ঠিকঠাক করার পর বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফরে গিয়েও সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা থেকে সরে আসার পেছনে কৌশলগত নানা বিবেচনা কাজ করেছে। চীনের হাত দিয়ে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি হোক, সেটা অনেকেই চায় না। বর্তমান পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ চীনের জড়িত হওয়ার বিরুদ্ধে’ ( ঢাকা ট্রিবিউন, ১১ জুন ২০১৫)। অপর দিকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরে মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে জাপান। তারই সাথে সাথে ইরানে চাবাহার বন্দর নির্মাণের পর এবার বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে আগ্রহী হয়ে উঠেছে ভারত। পটুয়াখালীর পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে আগ্রহ রয়েছে দেশটির। অর্থনৈতিক কারণে নয়, এ অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবেলার কৌশলগত কারণে এ বন্দর নির্মাণে আগ্রহী তারা। এটা এখন স্পষ্ট, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির নানা জটিল হিসাব-নিকাশের মধ্যে আটকা পড়েছে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দর।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ফলে সম্প্রতি আরব-আমিরাতের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। দেশটির ‘দুবাই পোর্ট ওয়ার্ল্ডের’ মাধ্যমে প্রস্তাবটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পেশ করা হয়। এভাবে বিভিন্ন দেশ আগ্রহ দেখালেও তাদের সাথে ফলপ্রসূ যোগাযোগ করা হয়নি। মহেশখালীর এই সমুদ্রবন্দর নির্মাণকারী আগ্রহী দেশগুলোর পক্ষ থেকে এটা বলা হয়েছে। এই মেগা প্রকল্পে এক হাজার কোটি ডলার এবং এ জন্য যৌথভাবে বিনিয়োগ দরকার। সর্বশেষ সম্ভাব্যতা যাচাই অনুযায়ী, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে প্রথমপর্যায়ে ২২৩ কোটি ডলার প্রয়োজন। এর মধ্যে পিপিপির আওতায় সম্পাদনযোগ্য ব্যয় ৭৬ কোটি ডলার। প্রকল্পে ব্যয়ের অবশিষ্ট ১০৪ কোটি ডলার এবং রিংক প্রকল্পের জন্য অতিরিক্ত ৫৫ কোটি ৯০ লাখ ডলার অন্য উৎস থেকে সংগ্রহ করা যাবে। সব মিলে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ২০১ কোটি ডলার সরবরাহ করতে হবে।

সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে আগ্রহী দেশগুলোর সাথে বিশ্বব্যাংক ও এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক এতে বিনিয়োগের ইঙ্গিত দিয়েছে। একই সাথে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ মোট ব্যয়ের ৩০ ভাগ অর্থ দিতে সম্মত রয়েছে। তার পরও মহেশখালী সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। প্রকল্প থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়ে সম্প্রতি নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, সোনাদিয়া ও পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প নৌ মন্ত্রণালয়ের আওতায় রয়েছে। কিন্তু আপাতত এগিয়ে রয়েছে পায়রা বন্দরের কাজ। এরই প্রতিফলন দেখিয়ে পায়রা বন্দরের জন্য ইতোমধ্যে ভূমি অধিগ্রহণের সংশোধিত আইন ২০১৫-এর অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী আরো জানান, ‘সোনাদিয়ার বদলে পটুয়াখালীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা হবে। পটুয়াখালীতে পায়রা বন্দরকে সাধারণভাবে নির্মাণ না করে গভীর সমুদ্রবন্দরে টেনে নেয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।’ সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প নির্মাণ থেকে সরে আসার কারণ হিসেবে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘মাতারবাড়ীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য সেখানে ছোট মানের একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কথা রয়েছে। এক সময় সেটিকে সোনাদিয়া পর্যন্ত টেনে নেয়া যেতে পারে। এমন ধারণা থেকে মূলত এ প্রকল্প থেকে সরে আসতে চাইছে সরকার।’ এমনকি প্রধানমন্ত্রীও সোনাদিয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহের কথা জানিয়েছেন বলে জানান পরিকল্পনামন্ত্রী। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের অধীনে সেখানে ছোট মানের একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পর মাত্র ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে সোনাদিয়ায় আরেকটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের চিন্তাভাবনা কতটুকু বাস্তবসম্মত? কোথায় বা কোনটি একটি পূর্ণাঙ্গ গভীর সমুদ্রবন্দর হতে যাচ্ছে বা দেশে একাধিক গভীর সমুদ্রবন্দর হতে যাচ্ছে অথবা আদৌ কোনো গভীর সমুদ্রবন্দর হচ্ছে কি না, তা এখন এক বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক অনলাইন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ নিউজের এক প্রতিবেদনে (২৪ জুন ২০১৫) সমুদ্র বাণিজ্য বিশ্লেষক ক্রিসপেন এট কিনসনকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘আমি ওই অঞ্চলে মাত্র একটি সমুদ্রবন্দরের সম্ভাবনা দেখি।’ তার মতে, ‘বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ সম্ভবত রাজনৈতিক।’ অধিকন্তু হঠাৎ করে সোনাদিয়া থেকে দৃষ্টি সরিয়ে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে পায়রাকে গুরুত্ব দেয়ায় দেশের ভেতরে-বাইরে সমালোচনার মুখে পড়েছে সরকার। এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা সূত্রে বাংলা নিউজের (১৯ জুন ২০১৫) প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে সরকার সোনাদিয়া থেকে মনোযোগ সরিয়ে পায়রায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। এটা দেশের স্বার্থে সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। কারণ, সোনাদিয়া আর পায়রার সম্ভাব্যতা সমান নয়। গভীর সমুদ্রবন্দর বলতে যা বুঝায় তা শুধু সোনাদিয়াতে সম্ভব, যেখানে বিদেশী বড় জাহাজগুলো কোনো অসুবিধা ছাড়াই নোঙর করতে পারবে। অথচ পায়রার দীর্ঘ এলাকা স্থল অংশের সাথে সংযুক্ত থাকায় সেই জাহাজগুলো থেকে মালামাল পরিবহনপ্রক্রিয়া বেশ জটিল হবে।

বৈদেশিক বাণিজ্য ও অর্থনেতিক উন্নয়নের গতির সাথে সঙ্গতি রক্ষার্থে মহেশখালীতে এ ধরনের একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ গোটা বাংলাদেশের মানুষ। কিন্তু সরকারের ‘সোনাদিয়া ডিপ সি পোর্ট প্রজেক্ট’ থেকে সরে আসার চিন্তাভাবনায় দেশের মানুষ উদ্বিগ্ন ও হতাশ। তারা মনে করে, সরকার সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প বাতিলের কৌশল হিসেবে মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রজেক্টকে সামনে নিয়ে আসা মানে গাধার সামনে মুলো ঝুলানোর নামান্তর। কারণ, মাতারবাড়ীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য সেখানে দু-তিনটি জেটি-বার্থ নিয়ে ছোট মানের একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কথা রয়েছে। অন্য দিকে, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর ৯৬টি জেটি-বার্থ নিয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যা ছিল পোর্ট অব সিঙ্গাপুরের চেয়েও বড়। সুতরাং জনগণের বহুলপ্রত্যাশিত গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রকল্প থেকে সরে এসে মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র টেনে এনে গভীর সমুদ্রবন্দরে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা শুভঙ্করের ফাঁকি ছাড়া আর কিছুই নয়। সরকার যদি শেষ পর্যন্ত সরে আসে তাহলে এ ধরনের জাতীয় স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত দেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থে সোনাদিয়াতেই গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজ দ্রুত শুরু করাই দেশবাসীর প্রত্যাশা। কিন্তু সরকারের এ প্রকল্প থেকে সুকৌশলে সরে আসার পরিকল্পনা দেশের উন্নয়নপ্রত্যাশী মানুষের মনে বহুবিধ প্রশ্নের অবতারণা করেছে। বিশেষ করে দেশপ্রেমিক মানুষের মনে প্রশ্ন, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে বিলম্ব হওয়ার নেপথ্য কারণ কি ভূরাজনৈতিক, না দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রতি বর্তমান সরকারের আস্থার সঙ্কট?

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য, সভাপতি বাংলাদেশ উপকূল বাঁচাও আন্দোলন (বাউবা)