॥ এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ ॥

[এ.এইচ.এম. হামিদুর রহমান আযাদ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি। নব্বইয়ের দশকের তুখোড় ছাত্রনেতা, পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে রাজপথের সংগ্রামী নেতা হামিদুর রহমান আযাদ ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন কক্সবাজারের দ্বীপাঞ্চল কুতুবদিয়া-মহেশখালী আসন থেকে।

মাওলানা সাঈদীর জীবন ও রাজনীতি নিয়ে তিনি একটি সোনালি ইতিহাস তুলে ধরেছেন সোনার বাংলার পাঠকদের উদ্দেশে। ছেলেবেলা থেকে দেখা, যৌবনে দাওয়াত দিয়ে মাহফিলে নিয়ে যাওয়া, তারপর অনেক অনেক ঘটনা- একজন প্রত্যক্ষদর্শীর দলিলের মতো উঠে এসেছে এ ইতিহাসের আলোচনায়। আশা করি, সাপ্তাহিক সোনার বাংলার পাঠকসমাজ চলমান এ নিবন্ধ পড়ে উজ্জীবিত হওয়ার পাশাপাশি উপকৃত হবেন। -সম্পাদক]

গত ১৪ আগস্ট, ২০২৩ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় কেন্দ্রীয় ইউনিটের বৈঠক চলছিল। বৈঠক চলাকালীন আমরা ভূমিকম্প অনুভব করি। তখন তাড়াতাড়ি বৈঠক শেষ করে ভূমিকম্প সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়ার জন্য সেলফোন হাতে নিলে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (রাহি.)-এর মৃত্যু-সংবাদ চোখে পড়ে। এর মধ্যে সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম ভাই জানালেন, আল্লামা সাঈদী সাহেব আর আমাদের মাঝে নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন)। এ সংবাদ পাওয়ার পর চোখের পানি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছিল। কিছুক্ষণ পর দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে অনেকেই সংবাদের সত্যতা জানার জন্য কল করতে থাকে। কেউ যেন বিশ্বাস করতেই পারছেন না। আগের দিন যে প্রিয় মানুষটিকে জান্নাতি হাসিমুখে মিডিয়ায় দেখতে পেয়েছে, তিনি আজ দুনিয়ার সফর শেষ করে সবাইকে কাঁদিয়ে মহান আল্লাহ তায়ালার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেলেন। সবার আশা ছিল, তিনি আবার কুরআনের ময়দানে ফিরে আসবেন এবং কুরআনের সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেবেন। আল্লামা সাঈদী (রাহি.)-এর মৃত্যু-সংবাদ যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন মনে হয় বাংলাদেশের মানুষের মাথার ওপরে যেন আকাশ ভেঙে পড়েছিল। শোকাহত জনতা বিএসএমএমইউ হাসপাতালের সামনে ভিড় জমিয়েছিল। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় ও মহানগরী নেতৃবৃন্দসহ আমিও সেখানে ছুটে গিয়েছিলাম। সেখানে উপস্থিত হয়ে দেখেছি, হাজার হাজার মানুষের কান্নার আওয়াজ এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা করেছে, যা হাসপাতালের রোগীসহ সবাইকে কাঁদিয়েছে। রাত যতই গভীর হচ্ছিল, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মানুষ পঙ্গপালের মতো ছুটে এসে হাসপাতালে ভিড় জমাচ্ছিল। তাদের আকুতি ছিল- প্রিয় মানুষটিকে একনজর দেখবে এবং জানাযার নামায আদায় ও দোয়া করে শেষ বিদায় জানাবে। এজন্য প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বার বার অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু সরকারের অন্যায় নির্দেশে প্রশাসন জানাযার নামায তো পড়তে দেয়নি, বরং তার পরিবর্তে টিয়ার গ্যাস, বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড দিয়ে জনগণকে হটিয়ে ইতিহাসের একটি বর্বরতম অধ্যায়ের সূচনা করা হয়। সেদিন তাৎক্ষণিকভাবে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি দেখে বোঝা যায়, মানুষ আল্লামা সাঈদীকে (রাহি.) ভালোবাসে কুরআনের জন্য, আল্লাহর জন্য। সে কথাটি দল-মত-নির্বিশেষে পৃথিবীর সবাই বুঝতে পারল, কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য বাংলাদেশের বর্তমান সরকার তা বুঝতে পারল না।

আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (রাহিমাহুমুল্লাহি আলাইহি) দল-মত-নির্বিশেষে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে শ্রদ্ধাভাজন ও প্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর মৃত্যু-সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে দেশ-বিদেশে সকলের মুখে একটি কথা উচ্চারিত হচ্ছে, আল্লামা সাঈদী ইতিহাসের এক কিংবদন্তির নাম। যিনি বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। তিনি ছিলেন একজন বিশ^খ্যাত ইসলামিক স্কলার, মুফাসসিরে কুরআন, জনপ্রিয় পার্লামেন্টারিয়ান, আল্লাহর প্রিয় বান্দা, আদর্শ মানুষ ও কুরআনের সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের বীর সেনানী। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত সৎ, তাকওয়াবান ও বিনয়ী, সৌজন্যবোধের অধিকারী একজন আকর্ষণীয় বিরল ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে স্মরণীয় ও বরণীয় করে রেখেছেন। তাঁর সন্তানদের মুখে পিতার আদর্শের কথা শুনে আমরা অভিভূত হই। পরিবারের সদস্যদের মাঝে তিনি সুন্দর জীবন উপস্থাপনের মাধ্যমে যে মডেল স্থাপন করেছিলেন, তা আমাদের সকলের জন্য অনুসরণীয়। তিনি তার আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও বন্ধুমহলে একই দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। সংগঠনের অভ্যন্তরে, রাজনৈতিক ময়দানে, জনগণের মাঝে ও পার্লামেন্টে একজন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব এবং মহান নেতা ছিলেন। তিনি আলেম সমাজের মাঝে উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন এবং জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছেন সর্বত্র। দল-মতের ঊর্ধ্বে থেকে নিজেকে যেভাবে এক মহান ব্যক্তিত্ব রূপে গড়ে তুলেছিলেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। তিনি শুধু দেশের অমূল্য সম্পদ ছিলেন তা নয়, বরং তিনি উম্মাহর সম্পদ ছিলেন। তার বর্ণাঢ্য জীবনের অনেক বিষয় আছে, যা এ স্বল্প পরিসরে আলোচনার সুযোগ নেই। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঘটনা স্মৃতির পাতা থেকে এখানে তুলে ধরতে চাই-

এক

আল্লামা সাঈদীকে (রাহি.) আমার প্রথম দেখার সৌভাগ্য হয় ১৯৭৮ সালে। তখন আমি লেখাপড়া করার জন্য চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার একটি গ্রামে বসবাস করতাম। তখন আমি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মী। ঐ বছর লোহাগড়া উপজেলায় চুনতির সিরাতুন্নবী (সা.) মাহফিলে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (রাহি.) আসার কথা শুনে গ্রামের ছাত্র-জনতার মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। মাহফিলের দিন সকাল বেলা আমরা বাঁশখালীর দুর্গম পাহাড়ি পথ ধরে পায়ে হেঁটে রওনা করলাম। সেই পাহাড়ি পথ ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এমনকি সেখানে কোনো কোনো সময় বন্যপ্রাণীর আক্রমণও হয়ে থাকে। এ ঝুঁকি উপেক্ষা করে আল্লামা সাঈদীর (রাহি.) মাহফিল শোনার জন্য মানুষ পঙ্গপালের মতো ছুটে চলেছে। বেলা ডোবার পূর্বেই মাহফিল স্থল ছাড়িয়ে আশপাশের এলাকায় লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। মঞ্চে দেশ বরেণ্য অনেক আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ ও উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত হন। সন্ধ্যার পর যথানিয়মে মাহফিল শুরু হয়। আল্লামা সাঈদী প্রায় দুই ঘণ্টার মতো আলোচনা করেন। অত্যন্ত সুন্দর ও সুললিত কণ্ঠ, চমৎকার উপস্থাপনা এবং কুরআনের যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা শুনে উপস্থিত শ্রোতাগণ সকলেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তখন থেকেই অনেকের মতো আমার মনের মণিকোঠায় আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (রাহি.) শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার স্থান করে নেন।

চুনতির মাহফিল থেকে ফিরে এসে আমার তরুণ বয়সের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাজাখালী ফাজিল মাদরাসার শিক্ষক ও ছাত্রদের মাঝে সেই দিনের মাহফিলের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করি। তা শুনে সকলের মধ্যে আল্লামা সাঈদীকে দেখার কৌতূহলের জন্ম নেয়। কীভাবে মাদরাসার মাঠে আল্লামা সাঈদীর মাহফিলের আয়োজন করা যায়? মাদরাসা কর্তৃপক্ষ পরামর্শ করে আমাকে তাদের কাক্সিক্ষত মেহমানের দাওয়াতের ব্যবস্থা করার জন্য দায়িত্ব প্রদান করে। তখন আমি চট্টগ্রাম শহরে এসে চট্টগ্রাম মহানগরী জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমীর ও ইসলামী সমাজকল্যাণ পরিষদের সভাপতি মাওলানা শামসুদ্দীন (রাহি.)-এর সাথে যোগাযোগ করে আল্লামা সাঈদীর মাহফিলের দিন-তারিখ চূড়ান্ত করি। এ খবর শুনে সকলেই খুব আনন্দিত হলেন। যে স্থানে মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছিল, তা ছিল অনেক বিশাল এক উন্মুক্ত ময়দান। বিশাল মাঠে তিলধারণের ঠাঁই নেই। মাঠের বাইরে আশপাশের এলাকাও লাখ লাখ মানুষের ঢল নামে। আল্লামা সাঈদী (রাহি.) মাহফিলের দিন বিকাল ৩টায় মঞ্চে আসেন। তখন মুহুর্মুহু স্লোগানে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে। মঞ্চ থেকে নাম ঘোষণার পর তিনি সুমধুর কণ্ঠে কুরআনের তাফসির শুরু করেন। মানুষ অধীর আগ্রহে নীরবে বয়ান শুনছিল। হঠাৎ আকাশে মেঘ দেখা গেল এবং ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি নামছিল। তখন মাদরাসার দালানের ছাদের ওপর থেকে লোকজন তাড়াহুড়া করে নামার চেষ্টা করছিল। এ সময় তিনি শ্রোতাদের উদ্দেশ করে বলেন, ভাইয়েরা আমার, বৃষ্টি কি আল্লাহর পক্ষ থেকে গজব না রহমত? তখন উপস্থিত লাখ লাখ জনতা সমস্বরে বলে উঠল রহমত। তখন তিনি বললেন, তাহলে সবাই বসুন। এ কথা বলার সাথে সাথে সবাই শান্তিপূর্ণভাবে বসে পড়ে। অতঃপর তিনি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ জিকির শুরু করেন। তার সাথে লাখো শ্রোতার সম্মিলিত জিকিরে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। এর মধ্যে আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছায় বৃষ্টি থেমে গেলে তিনি দীর্ঘসময় ধরে কুরআনের তাফসির করেন। এতে দূরদূরান্ত থেকে আসা বৃষ্টিভেজা মানুষের হৃদয় মন জুড়িয়ে যায়। এভাবে তিনি বিভিন্ন মাহফিলে উদ্ভূত পরিস্থিতি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে নিয়ন্ত্রণ করতেন। এক্ষেত্রে কুরআনের মাহফিলের প্রতি শ্রদ্ধার পাশাপাশি শ্রোতাদের ওপর ওনার ব্যক্তিত্বের প্রভাব ছিল অতুলনীয়।

 দুই

আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (রাহি.) চট্টগ্রাম শহরে প্রতি বছর ৫ দিন করে কুরআনের তাফসির করতেন। প্রথমদিকে চট্টগ্রাম মিউনিসিপাল হাইস্কুল মাঠ এরপর চট্টগ্রাম কলেজিয়েট হাইস্কুল মাঠে কুরআনের তাফসির মাহফিল অনুষ্ঠিত হতো। পরে তা প্যারেড ময়দানে স্থানান্তর হয়। লাখ লাখ জনতার এ তাফসিরুল কুরআন মাহফিলে পবিত্র কাবা শরীফের সম্মানিত ইমাম দুবার প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। চট্টগ্রামের তৎকালীন সেনানিবাসের জিওসি ও পরবর্তীতে বাংলাদেশের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম নুরুদ্দীন খান সাহেবকেও (পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের এমপি, মন্ত্রী ছিলেন) স্টেজে বসে ওনার বক্তব্য শুনতে দেখেছি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ, শিক্ষক, সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, ছাত্র, যুবক, মহিলা, হিন্দু-মুসলিম দল-মত নির্বিশেষে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ দলে দলে মিছিল নিয়ে মাহফিলে যোগদান করতো। চট্টগ্রামের প্রতিটি সড়ক মুখরিত হতো “আল-কুরআনের আলো ঘরে ঘরে জ¦ালো” Ñএ স্লোগানে। পুরো চট্টগ্রাম উৎসবের নগরীতে পরিণত হতো।

১৯৮৩ সালে আমি চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ে অনার্স প্রথমবর্ষে ভর্তি হই। সে সময়ে দেখেছি বিশ^বিদ্যালয়ের বাসে করে শিক্ষক, ছাত্র ও কর্মচারীগণ মাহফিলে অংশগ্রহণ করতেন। আমিও প্রতি বছর এ তাফসির মাহফিলে যোগদান করে বেশ অনুপ্রেরণা লাভ করতাম। এককথায় সেখানে কুরআনপ্রেমীদের বার্ষিক একটি মিলনমেলা হতো। লাখ লাখ মানুষের এ মাহফিল ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। পিনপতন নীরবতায় মানুষ কুরআনের তাফসির শুনতেন। আবার কখনো কখনো মনের আবেগে বিভিন্ন স্লোগানে আলোড়িত করত সমগ্র ময়দান। এভাবে কুরআনের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে আল্লামা সাঈদীর প্রতি জনসাধারণের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অন্তরের গভীরে স্থান করে নেয়। তাঁর প্রতি মানুষের ভালোবাসা দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ^ময় ছড়িয়ে পড়েছিল। মাহফিলে যারা অংশগ্রহণ করতে পারতেন না, তারা প্রতিটি মাহফিলের অডিও, ভিডিও ক্যাসেট সংগ্রহ করে কুরআনের তাফসির শুনতেন। কুরআনের তাফসিরের মাধ্যমে তিনি দীনের দাওয়াত প্রসারের জন্য বিশাল কাজ করে গেছেন। ওনার তাফসির শুনে অসংখ্য সাধারণ মানুষ ও ছাত্র-যুবক কুরআনের বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন করে অন্ধকার জীবন ছেড়ে আলোর পথে আসার এবং ইসলামের আলোকে জীবন গড়ার সুযোগ লাভ করে। অনেক অমুসলিমও ওনার হাতে কালেমা শাহাদাত পড়ে ইসলামের পতাকাতলে আসার সৌভাগ্য অর্জন করে।

ইসলামের এ অগ্রযাত্রা দেখে প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে ইসলামবিরোধী শক্তিগুলো মাহফিল বন্ধ করার অপচেষ্টা চালায়। চট্টগ্রামে তারা হরতাল ডেকে মাহফিল বন্ধ করার জন্য উত্তেজনাকর পরিবেশ তৈরি করে। এর বিরুদ্ধে কুরআনপ্রেমী মানুষ রাস্তায় নেমে তীব্র প্রতিবাদ জানালে প্রশাসন চট্টগ্রাম কলেজ সংলগ্ন প্যারেড ময়দানে মাহফিলের অনুমতি দিতে বাধ্য হয়। হরতালের মধ্যে কর্তৃপক্ষ প্যারেড ময়দানে ৫ দিনব্যাপী মাহফিলের আয়োজন করে। মাহফিলের প্রথম দিন সন্ধ্যার পর আল্লামা সাঈদী মঞ্চে উপস্থিত হলে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। উপস্থিত লাখ লাখ বিক্ষুব্ধ জনতা মুহুর্মুহু স্লোগানে পুরো চট্টগ্রাম প্রকম্পিত করে। তখন আল্লামা সাঈদী বিক্ষুব্ধ জনতাকে শান্তিপূর্ণভাবে বসে পড়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “কুরআনের দুশমনরা তাফসির মাহফিল বন্ধ করতে চেয়েছিল, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তার কিতাবের মাহফিলকে আরো বরকতময় করে দিয়েছেন। তাদের বিরোধিতার কারণে আরো বড় মাঠে মাহফিলের আয়োজন করার সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং হরতালে দোকানপাট বন্ধ থাকায় মানুষ দলে দলে মাহফিলে যোগদান করতে পেরেছে”। এ প্রসঙ্গে তিনি কুরআনের সূরা সফ-এর ৮নং আয়াতটি ব্যাখা করে শোনান, “আল্লাহ তায়ালা বলেন, তারা মুখের ফুঁৎকারে আল্লাহর আলো নিভিয়ে দিতে চায়। আল্লাহ তার আলোকে পূর্ণরূপে বিকশিত করবেন। যদিও কাফেররা তা অপছন্দ করে।”

চট্টগ্রামের প্যারেড ময়দানে ২৯ বছর, খুলনা সার্কিট হাউস ময়দানসহ শহরের বিভিন্ন মাঠে প্রতি বছর ২ দিন করে দীর্ঘ ৩৮ বছর, সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসা মাঠে প্রতি বছর ৩ দিন করে দীর্ঘ ৩৩ বছর, রাজশাহী সরকারি মাদরাসা মাঠে প্রতি বছর ৩ দিন করে দীর্ঘ ৩৫ বছর, বগুড়া শহরে প্রতি বছর ২ দিন করে দীর্ঘ ২৫ বছর, ঢাকার মতিঝিল মডেল হাইস্কুল ও কমলাপুর রেলওয়ে মাঠ এবং পল্টন ময়দানে প্রতি বছর ৩ দিন করে দীর্ঘ ৩৪ বছর, কুমিল্লা কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে তিনদিনব্যাপী প্রায় দীর্ঘ ৩১ বছর যাবৎ তার তাফসির মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এমনকি দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তিনি কুরআনের তাফসির মাহফিল করে আন্তর্জাতিক মুফাসসিরে কুরআন হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন।

কুরআনের তাফসির মাহফিলের কোনো কোনো স্থানে ইসলামবিরোধী শক্তি সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা করলে, আল্লামা সাঈদী মাহফিলের স্টেজ থেকে আল্লাহু আকবার হুংকার দিয়ে বলেছিলেন, “আমাকে ভয় দেখিয়ে কি লাভ। আমি তো জ¦লন্ত আগুনে নিক্ষিপ্ত সেই ইব্রাহিম (আ.)-এর দুঃসাহসী সন্তান। একমাত্র শাহাদাতের মৃত্যু ছাড়া আল্লাহর কুরআনের ময়দান থেকে দুনিয়ার কোনো শক্তি আমাকে স্তব্ধ করতে পারবে না, ইনশাআল্লাহ”। এভাবে তিনি সর্বদা নিজে আল্লাহর কাছে শাহাদাতের মৃত্যু কামনা করতেন এবং মানুষকে এ পথে উজ্জীবিত করতেন। বস্তুত কোনো মুমিন যখন অন্তর থেকে শাহাদাতের তামান্না পোষণ করেন, তখন আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তিকে পরোয়া করে না। আল্লামা সাঈদী ছিলেন কুরআনের সেই সাহসী সৈনিক, যিনি জীবনবাজি রেখে নির্ভয়ে সত্যকে মানুষের কাছে তুলে ধরতেন।

তিন

আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (রাহি.) ঢাকার শহীদবাগে নিজ বাসভবনে বসবাস করতেন। ওনার বাসভবনে একসময় বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ-এর দায়িত্বশীলদের মেস ছিল। পরবর্তী সময়ে তা পাশের মহল্লা শাহজাহানপুরে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৯৩ সালে আমার ওপর বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা মহানগরীর (দক্ষিণ) সভাপতির দায়িত্ব অর্পিত হলে চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের অনেক স্মৃতিবিজড়িত ক্যাম্পাস ছেড়ে ঢাকায় চলে আসতে হয়। পবিত্র রমজান মাসের এক সকালে আল্লামা সাঈদী (রাহি.)-এর তৃতীয় পুত্র মাসুদ সাঈদী মেসে এসে আমাকে জানাল, আব্বা যেকোনো একদিন মহানগরী সভাপতিকে সাথে নিয়ে বাসায় ইফতার করতে চান। এ কথা শুনে আমি বেশ আনন্দিত হয়ে দাওয়াত গ্রহণ করলাম। অন্যান্য প্রোগ্রাম রিশিডিউল করে ওনার সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যে একদিন পর মহানগরী সেক্রেটারি ডা. এনামুল হক ভাইকে নিয়ে বাসায় প্রবেশ করে দেখি, তিনি চাদর বিছানো ফ্লোরে সন্তানদের নিয়ে আলোচনা করছেন। আমরা উপস্থিত হলে তিনি আমাদের বুকে জড়িয়ে ধরে দোয়া করলেন। পাশে বসিয়ে কুশলাদি বিনিময়ের পর সংগঠনের খোঁজখবর নিলেন। অতঃপর ইফতারের পূর্বে দোয়া শেষে নিজ হাতে আমাদের মেহমানদারি করলেন। ওনাকে বেশিরভাগ সময় দূর থেকে দেখেছি, দু-একবার সাক্ষাৎও হয়েছে। কিন্তু এত কাছে বসে ঘনিষ্ঠভাবে সান্নিধ্য লাভের সুযোগ হয়নি। সেই দিন ওনার ব্যক্তিত্বের প্রভাব, সুন্দর ব্যবহার, আন্তরিকতাপূর্ণ আতিথেয়তা, পরিবারের সদস্যদের আদর ও স্নেহের মায়ায় ইসলামের আলোকে গড়ে তোলার অপূর্ব দৃশ্য আমাদের বিমোহিত করে। সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম, তিনি ছিলেন জীবনের সকল স্তরে একজন আদর্শ মানুষ।

চার

আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (রাহি.) একজন মর্দে মুমিন ও দীনের পথে অকুতোভয় সৈনিক ছিলেন। তিনি কুরআন-হাদীসের আলোকে মানুষের কাছে মানবরচিত মতবাদের ব্যর্থতা ও শিরক-বিদাতের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য রাখতেন। এজন্য মাজার ব্যবসায়ী ও নাস্তিক-মুরতাদরা ওনার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। তথাপি তিনি নির্ভয়ে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল রেখে চলাফেরা করতেন।

১৯৯৮ সালে আমি জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরীর অবিভক্ত সবুজবাগ থানার দায়িত্বে ছিলাম। তখন আমার নিজ উপজেলা কুতুবদিয়ার মাহফিলে একসাথে যাওয়ার পথে একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনায় ওনার সাহসিকতা আমাকে হতবাক করেছে। মাহফিলের দিনটি ছিল জুমাবার। বিমানের একটি ফ্লাইটে মাওলানা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান। তাকে নিয়ে ঐদিন আমি চট্টগ্রাম মহানগরীর তৎকালীন আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা আবু তাহের এবং অধ্যাপক মফিজুর রহমান ভাইসহ চট্টগ্রাম থেকে রওনা হই। ওনার গাড়িটি কক্সবাজার সড়কের ওপর দিয়ে আমাদের গাড়ির সামনে পথ চলছিল। জুমার সময় ঘনিয়ে আসায় তিনি চন্দনাইশ এলাকায় একটি মসজিদ দেখে নামাযের জন্য গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়েন। উক্ত এলাকাটি ছিল একটি বিশেষ তরীকার অনুসারীদের প্রভাবাধীন। আমরা খুবই শঙ্কিত ছিলাম যে, সেখানে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে কিনা? তাই আমরাও গাড়ি থামিয়ে দ্রুত নেমে আল্লামা সাঈদীকে (রাহি.) এ মসজিদে প্রবেশ না করার অনুরোধ করি। কিন্তু তিনি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ বলে মসজিদে ঢুকে পড়েন। মসজিদে প্রবেশ করার পর ভিন্ন এক চিত্র অবলোকন করি। হঠাৎ আল্লামা সাঈদীকে (রাহি.) দেখে সকল মুসল্লি দাঁড়িয়ে গেলেন এবং ইমাম সাহেব সামনে এগিয়ে এসে ওনাকে সালাম দিয়ে মোলাকাত করে মেহরাবের দিকে নিয়ে গেলেন। ইমাম সাহেবের অনুরোধে আল্লামা সাঈদী (রাহি.) জুমার খুতবা ও নামাজ পড়ান। সাধারণত ঐ তরীকার অনুসারীদের পরিচালিত মসজিদে এ ধরনের ঘটনা বিরল, যা আল্লামা সাঈদীর ক্ষেত্রে ঘটেছে। তার ব্যক্তিত্ব এতটাই আকর্ষণীয় ছিল যে, ওনার সান্নিধ্যে এসে দুশমনরাও শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে পড়ত। সেদিনের দৃশ্য মনে পড়লে আজও আমার কাছে অবিশ^াস্য মনে হয়।

সালাতুল জুমা আদায়ের পর আমাদের গাড়িবহর আবার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক ধরে চলতে থাকল। পথের ধারে একটি নীরব স্থানে সেই ভর দুপুরে আমরা থামলাম দুপুরে খাবারের জন্য। চট্টগ্রাম থেকে প্যাকেট করা ভাত, সবজি, ডাল গাড়িতে বসে খাওয়া-দাওয়া। খাবার সেরে মাওলানা বললেন, ‘এটাও একটি অভিজ্ঞতা।’ খাবার পরে আবার যাত্রা। এবার চকরিয়ার চিরিংগা বাজার হয়ে বর্তমান পেকুয়া উপজেলা হয়ে আমরা এসে পৌঁছলাম মগনামাঘাটে। এখান থেকে একটি সরল রেখার মতো দেখা যায় কুতুবদিয়া।

মাগনামা ঘাট থেকে আমরা স্পীড বোটযোগে উত্তাল বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে নিরাপদে কুতুবদিয়ায় পৌঁছি। আশপাশের উপজেলার মানুষ দলে দলে মাহফিলে অংশগ্রহণ করে। এলাকার লোকদের ভাষ্য অনুযায়ী বঙ্গোপসাগরবেষ্টিত এ দ্বীপের সকল মানুষ বাড়িঘর, দোকানপাট বন্ধ করে মাহফিলে হাজির হয়েছিল। তিনি সন্ধ্যার পর মাহফিলে কুরআনের তাফসির পেশ করেন। পরেরদিন কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের জেলেপাড়া ময়দানে প্রতি বছরের ন্যায় ওনার তাফসির মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। আমিও আল্লামা সাঈদীর সাথে উক্ত মাহফিলে উপস্থিত হই। ঐ মাহফিলে ওনার আলোচনায় কুতুবদিয়াকে নিয়ে একটি হাসি-রহস্যের ঘটনা ঘটে। পূর্বের দিন কুতুবদিয়ার মেহমানদারিতে সামুদ্রিক মাছের তরকারি ছিল। মাছটি ওনার অপরিচিত হওয়ায় তিনি নাম জিজ্ঞেস করলে আমরা কক্সবাজারের স্থানীয় নাম ‘গোয়ারা মাছ’ বলে জানাই। কক্সবাজারে মাহফিলে আলোচনার একপর্যায়ে তিনি রসিকতা করে গোয়ারা মাছকে বলেছিলেন, ‘গোমরা মাছ’। মানুষ গোমরা হয় এটি জানতাম, কিন্তু কুতুবদিয়া এসে জানতে পারলাম মাছও গোমরা হয়। এ কথা শুনে শ্রোতাগণ সমস্বরে হেসে দেয়। এভাবে তিনি সাধারণ বিষয়কে সুন্দরভাবে উপমা দিয়ে আলোচনাকে সহজবোধ্যভাবে বুঝিয়ে দিতে সক্ষম ছিলেন। তাফসির মাহফিলের ময়দানে তিনি শ্রোতাদের সময়োপযোগী বিষয় ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় ইসলামের দাওয়াত তুলে ধরতেন। আবার কখনো কখনো নবী-রাসূল, সাহাবায়ে কেরামের ত্যাগের ইতিহাস তুলে ধরে তাদের মাঝে ইসলামের বৈপ্লবিক চেতনা তৈরি করতেন, যা একজন যোগ্য দাঈ ইলাল্লাহর অনন্য বৈশিষ্ট্য।

পাঁচ

আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (রাহি.) ছিলেন তাফসির ও ওয়াজ-মাহফিলের ময়দানে নতুন ধারার প্রবর্তক। তাফসির মাহফিলের ময়দানে তিনি বৈপ্লবিক ধারার প্রবর্তন করেছিলেন। এর পূর্বে ওলামায়ে কেরামগণ তাদের মাহফিলে ব্যক্তিগতভাবে ধর্মীয় হুকুম-আহকাম পালনের ফজিলত ও বিভিন্ন কিচ্ছা-কাহিনী বর্ণনার মাধ্যমে ইসলামকে নিছক একটি ধর্ম হিসেবে প্রচার করতেন। আল্লামা সাঈদী প্রচলিত এ ধারা থেকে বের হয়ে কুরআন-হাদিস ও সময়োপযোগী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা চালান। এর প্রভাব সাধারণ শ্রোতাদের পাশাপাশি ওলামা ও ওয়ায়েজীনদের মাঝে পরিলক্ষিত হয়। ফলে ওলামা ও ওয়ায়েজীনগণও আল্লামা সাঈদী সাহেবের মাহফিলে অংশগ্রহণ করতেন। ওনার আলোচনার বিষয়বস্তু ও উপস্থাপন কৌশল রপ্ত করে নিজেদের মাহফিলে শ্রোতাদের চাহিদা পূরণের চেষ্টা করতেন। অতএব আল্লামা সাঈদী ছিলেন তাফসিরের ময়দানের সমকালীন রোলমডেল।

আল্লামা সাঈদীর (রাহি.) ক্ষেত্রে কে কোন দলের, কোন পেশার, কোন ধর্মের লোক, তা বিবেচনা নয়। তিনি জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা একজন আদর্শ নেতা ও একজন উচ্চমানের দাঈ ইলাল্লাহ। তিনি স্বীয় প্রতিভা ও যোগ্যতা দিয়ে দলীয় পরিচয়ের বাইরে নিজের ইমেজ, সুনাম ও মর্যাদা যেভাবে গড়ে তুলেছিলেন, তা একটি ব্যতিক্রমধর্মী ইতিহাস। যারা আল্লামা সাঈদী সাহেবের তাফসির শুনেছেন, তাদের অধিকাংশ লোকই কুরআনের সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছেন। সাংগঠনিক জীবনে আমি অনেককে পেয়েছি যারা বলেছেন, আল্লামা সাঈদীর তাফসির শুনে ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান এবং ইকামতে দীন প্রত্যেক মুমিনের জন্য ফরজ ইবাদত এ কথা বুঝতে পেরেছি। এ উদ্দেশ্যে জামায়াতবদ্ধ সাংগঠনিক জীবনযাপনের জন্য জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেছি। দীনের একজন দক্ষ দাঈ হিসেবে ইসলামকে শুধুমাত্র একটি ধর্ম হিসেবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করেননি। বরং যুগ যুগ ধরে মানুষের লালিত-পালিত চিন্তাধারার পরিবর্তন করে ইসলামকে একটি জীবনব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করে সফলতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। বাংলাদেশের খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবী ও একুশে পদকপ্রাপ্ত লেখক আহমদ ছফা তার এক প্রবন্ধে আল্লামা সাঈদীর তাফসিরের ক্যাসেটের প্রভাব সম্পর্কে একটি বিরল ঘটনা তুলে ধরেছেনÑ “আমার বিচারে স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোত্তম আশ্চর্য বস্তু হলোÑ হযরত মাওলানা আলহাজা দেলাওয়ার হোসান সাঈদী। তাঁকে কী কারণে এ দুর্লভ সম্মানে ভূষিত করতে হলো, সেটা একটু ব্যাখ্যা করার দাবি রাখে। গত ফাল্গুনে আমি গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখি, আমার ভ্রাতৃবধূ কে-টু সিগারেট পান করছেন এবং ক্যাসেটে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেবের মিলাদ শুনছেন। আমার বাবা-মা যদ্দিন বেঁচেছিলেন, ওই মহিলাকে জোর করে একবারও নামাযের পাটিতে দাঁড় করাতে পারেননি। আমার ভাইও অনেক চেষ্টা করে ক্ষান্ত দিয়েছিলেন। আমি দেখলাম, হযরত সাঈদী এ মহিলার অন্তরে ধর্মপিপাসা জাগ্রত করতে সক্ষম হয়েছেন। তারপরও যদি তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতি দিতে আমি রাজি না হই, নিজের উৎকৃষ্ট অংশের প্রতি আমি অবিচার করব। ভাবীর এ রূপান্তর দেখে আমি নিজেও হযরতের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছি। তার কারণ আছে। অন্য মাওলানার মিলাদ আমি শুনেছি। তাঁরা ধর্মকথা-পুণ্যকথা বলেন। কিন্তু সেগুলো বোরিং লাগে। মাওলানা সাঈদীর ক্যাসেট যখন শুনলাম, বুঝতে পারলাম মিলাদ কাকে বলে। এখানে ধর্ম অর্থ মোক্ষ কাম সব মেলে। হযরত সাঈদী যদি গান করতেন, মাইকেল জ্যাকসনের কাছাকাছি পৌঁছতেন। অভিনয় করলে ছবি বিশ্বাসকে ছাড়িয়ে যেতেন। নাচ করলে বুলবুল চৌধুরীর রেকর্ড ম্লান হয়ে যেত। …। তাঁকে কী করে আমি সামান্য মানুষ বলব। সুতরাং বরণীয়-স্মরণীয়দের তালিকায় আমি সাঈদী সাহেবকে একটা জায়গা দিয়ে বসে আছি।” (ত্রি বঙ্গাশ্চর্য পরিচয়/আহমদ ছফা) নিকট ও দূরের প্রসঙ্গ, ১৯৯৫।

এ প্রেক্ষিতে সুস্পষ্টভাবে বলা যায়, আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (রাহি.) কুরআনের সম্মোহন শক্তি দ্বারা শুধুমাত্র নিজে আলোকিত হয়েছেন তা নয়, বরং লাখো জনতার অন্তরে কুরআন, হাদিস, সুন্নাহ এবং হেদায়েতের আলো জ¦ালিয়ে গেছেন। (চলবে)