চতুর্থ পর্ব
রাজধানী ঢাকার নাজিম উদ্দীন রোডে অবস্থিত তৎকালীন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ২৬নং সেলে জেল কোড অনুযায়ী ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দীদের জন্য ১টি ইংরেজি ও ৩টি বাংলা পত্রিকা সরবরাহ করা হতো। আমরা সকালে নাশতার পর বারান্দায় সোফায় বসে পত্রিকা পড়তাম। সেখানকার বন্দীরা সকলেই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। আল্লামা সাঈদী ছিলেন দল-মত-নির্বিশেষে সকলের শ্রদ্ধার পাত্র। ঐ সময়ের একটি দৃশ্য আমাকে অভিভূত করে। শীতের দিনের এক সকালে কয়েকজন ভিআইপি বন্দী বারান্দার সামনে রোদে বসে পত্রিকা পড়ছিলেন। তখন আল্লামা সাঈদী সাহেব রুম থেকে বেরিয়ে পত্রিকা পাঠের উদ্দেশ্যে আসেন। ওনাকে দেখার পর সকলে দাঁড়িয়ে গেলেন। উনি না বসা পর্যন্ত সবাই ওনার সম্মানে দাঁড়িয়েই থাকলেন। আল্লামা সাঈদী সাহেবের প্রতি সাবেক মন্ত্রী, এমপি, আইজিপি পর্যায়ের ব্যক্তিদের সম্মান প্রদর্শনের যে দৃশ্য আমি অবলোকন করেছি, তা ছিল সর্বমহলে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও উন্নত ব্যক্তিত্বের প্রভাব। এর দ্বারা বোঝা যায়, কুরআনের মুফাসসির ও ইসলামিক স্কলার হিসেবে এ দেশের মানুষের মাঝে ওনার সাংগঠনিক পরিচয়ের বাইরে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান সর্বমহলে তৈরি হয়েছিল। আল্লামা সাঈদী মামলার জন্য আদালতে যাতায়াত করতেন। সকালে জেলখানা থেকে আদালতে যাওয়ার জন্য রওনা হলে সাধারণ বন্দীরা জেলের রাস্তায় ও গেটের পাশে ভিড় জমাতো। ওনার সাথে সালাম বিনিময় ও মোলাকাত করার জন্য বন্দীরা হুমড়ি খেয়ে পরতো। এ অবস্থা দেখে কারা কর্তৃপক্ষ বন্দীদের বিরত রাখার জন্য মাইকে ঘোষণা দিতো। এতেও বন্দীরা নিবৃত্ত হতো না। হুজুরের দোয়া নেয়ার জন্য অনেকেই কৌশলে আশপাশে চলে আসতো। জেল গেটের পাশে বন্দীদের মৎস্য প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। অনেকে আল্লামা সাঈদীর মোলাকাত লাভের জন্য প্রশিক্ষণে নাম লেখাতো। এ দৃশ্য অবলোকন করে কারা কর্তৃপক্ষ এ প্রশিক্ষণও বন্ধ করে দিয়েছিল। এতে প্রতীয়মান হয়- তিনি সকলের নিকট একজন শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। মূলত ওনার এ জনপ্রিয়তাই জালিম সরকারের রোষানলে পড়ার মূল কারণ।
একজন রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য বা জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষনেতা আল্লামা সাঈদীর একমাত্র পরিচয় নয়, বাংলাদেশ থেকে শুরু করে বিশ^জুড়ে তাঁর পরিচয় তিনি পবিত্র কুরআনের খাদেম বা মুফাসসিরে কুরআন। ২০০৬ সালের ৭ আগস্ট লন্ডন থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ইউরো বাংলা পত্রিকায় আল্লামা সাঈদী সম্পর্কে লেখা হয়েছে, “পৃথিবীর প্রায় ২৫০ মিলিয়ন মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে, নিজের মনের ভাব প্রকাশ করে। বাংলাদেশ, ভারত ছাড়াও ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এ বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে যিনি গত চল্লিশ বছর ধরে বিরতিহীনভাবে কুরআনের দাওয়াত পৌঁছানোর কাজ করে যাচ্ছেন, তিনি হচ্ছেন আমাদের কালের একজন বড় মাপের কুরআনের পণ্ডিত আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী।”
তিনি ছিলেন একজন পরোপকারী এবং মানবদরদি ব্যক্তি। জেলখানায় বন্দী জীবনের কষ্ট নিয়ে জীবনযাপন করতেন আবার অন্যের কষ্টের খোঁজখবর রাখতেন। একদিন কারাগারে আমি ফুড পয়জনিংয়ের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। খবর পেয়ে তিনি আমার রুমে ছুটে গিয়েছিলেন। আমাকে দীর্ঘসময় বসে সেবা করেছিলেন এবং কারা কর্তৃপক্ষ, ডাক্তার দ্রুত ডেকে এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন। সেদিন আমাকে নিয়ে ওনার যে পেরেশানি আমি লক্ষ করেছি, সত্যিই তিনি একজন মানবদরদি মানুষ ছিলেন। একই ধরনের ঘটনা আমার আগে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ও সাবেক সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। ডা. তাহের ভাই ঐ সময় গ্রেফতার হয়ে ২৬নং সেলে বন্দী ছিলেন। একদিন ওনার প্রচণ্ড জ¦র হয়। আল্লামা সাঈদী সাহেব কারা কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করে রাত্রিবেলা ওনার এবং ডা. তাহের ভাইয়ের কক্ষ লকআপ না করার ব্যবস্থা করেছিলেন। ডা. তাহের ভাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী আল্লামা সাঈদী সারা রাত জেগে থেকে ওনার সেবা করেছিলেন। সেখানে আরো অনেককে বিভিন্ন সময় তিনি সেবাযত্ন দিয়েছিলেন, তা আমি শুনেছি। তাঁর জেলে থাকাকালীন এ ধরনের আচরণ হযরত ইউসুফ (আ.)-এর জেল জীবনের ঘটনাবলী স্মরণ করিয়ে দেয়। হযরত ইউসুফ (আ.) কারাগারে বন্দীদের সাথে সেবা ও সদাচরণের মাধ্যমে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। এরপর তাদের মাঝে আল্লাহর উলুহিয়াতের দাওয়াত পেশ করেছিলেন। পবিত্র কুরআনের সূরা ইউসুফে ৩৯-৪০ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে কারাগারের সঙ্গীরা, পৃথক পৃথক অনেক উপাস্য ভালো, না পরাক্রমশালী এক আল্লাহর? তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে নিছক কতগুলো নামের ‘এবাদত কর, সেগুলো তোমরা এবং তোমাদের বাপ-দাদারা সাব্যস্ত করে নিয়েছে। আল্লাহ এদের কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি।’ আল্লাহ ছাড়া কারও বিধান দেয়ার ক্ষমতা নেই। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করো না। এটাই সরল পথ। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।”
বারো
আল্লামা সাঈদী (রাহি.) সারা জীবন মানুষকে আল্লাহর দীনের দাওয়াত দিয়ে গেছেন। কারাগারের বাইরে থাকতে যেমনিভাবে দেশে-বিদেশে কুরআনের দাওয়াত পৌঁছিয়েছেন, তেমনি জেলখানায় বন্দী থাকা অবস্থায়ও তাঁর এ দাওয়াতি কার্যক্রম বন্ধ থাকেনি। আমি তা স্বচক্ষে দেখেছি। জেলখানার বন্দীদের সাথে হাঁটা-চলার সময়, খাওয়ার টেবিলে, নামাযের আগে-পরে এবং পত্রিকা পড়ার সময় যখনই সুযোগ পেতেন, সুকৌশলে দাওয়াতি কাজ করতেন।
কখনো কখনো এমন দৃশ্য দেখেছি, সন্ধ্যা অথবা রাতের খাবারের পর ২৬নং সেলের বারান্দার গ্রীলের সাথে দাঁড়িয়ে কারারক্ষীরা আল্লামা সাঈদীকে একনজর দেখা, সালাম দেয়া, কথা বলা এবং দোয়া নেয়ার জন্য ভিড় জমাতো। তখন আল্লামা সাঈদী এগিয়ে এসে তাদের সাথে হাত মেলাতেন। এতে কারারক্ষীরা অত্যন্ত আনন্দিত হতো এবং অনেকে মনের আবেগে চোখের পানি ছেড়ে দিত। তারা ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন এবং মাসালা-মাসায়েল সম্পর্কে জানতে চাইলে আল্লামা সাঈদী খুব সুন্দরভাবে তাদের বুঝিয়ে দিতেন। তাদের নিয়মিত নামায-রোজা ও শরিয়তের বিধিবিধান মেনে চলার জন্য উপদেশ দিতেন। পাশাপাশি তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের সুখ-দুঃখের কথাসহ অনেক বিষয়ে খোঁজখবর নিতেন। নিজের রুম থেকে খাবার এনে তাদের আপ্যায়ন করাতেন। একজন দাঈ ইলাল্লাহ হিসেবে ব্যবহারিক জীবনের মাধ্যমে মানুষকে আকৃষ্ট করে ইসলামের প্রতি প্রভাবিত করার এ ব্যতিক্রমধর্মী চরিত্র বন্দীজীবনে অতুলনীয় যা সাধারণত খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
আল্লামা সাঈদীর দাওয়াতি কাজের বড় হাতিয়ার ছিল তাঁর সমৃদ্ধ জ্ঞানভাণ্ডার। মানুষের কাছে ইসলামের সঠিক পরিচয় সময়োপযোগী করে তুলে ধরার জন্য তিনি নিয়মিত জ্ঞানচর্চা করতেন। বাসা, জেলখানা; এমনকি আদালতে যাওয়া-আসার সময়ও ওনার হাতে মহাগ্রন্থ আল কুরআন বা বিভিন্ন ধরনের বই লক্ষ করা যেত। ওনার গ্রেফতার হওয়ার কিছুদিন আগের একটি ঘটনা আমার স্মৃতিতে কখনো কখনো ভেসে আসে। ঐ সময় আমার এলাকার মক্কাপ্রবাসী নুরুল ইসলাম ভাই দেশে এসেছিলেন। তিনি আল্লামা সাঈদীর ভক্ত ছিলেন। মক্কা থেকে আসার সময় ওনার জন্য কিছু হাদিয়া এনেছিলেন। হাদিয়াগুলো দেয়ার জন্য আল্লামা সাঈদীর শহীদবাগের বাসায় আমাকে সাথে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানালে আমি সানন্দে রাজি হই এবং আল্লামা সাঈদীর সাথে ফোনে যোগাযোগ করি। আল্লামা সাঈদী আমাদের সন্ধ্যার পর ওনার বাসায় সময় দেন। বাসায় পৌঁছার পর ড্রইং রুমে বসে কুশলবিনিময় ও আতিথেয়তা শেষে তিনি আমাদের ৫ম তলায় নিয়ে যান। সেখানে একটি কক্ষের দরজা খুলে আমাদের প্রবেশ করতে বলেন। প্রবেশ করে বুঝতে পারলাম কক্ষটি ওনার স্টাডি রুম। সুন্দর, পরিপাটি ও গোছানো একটি কক্ষ। টেবিল, চেয়ার ও চারদিকে বুকসেলফ সেট করা। সেলফের ভেতরে সারি সারি রাখা তাফসির, হাদিস গ্রন্থ ও দেশি-বিদেশি লেখকদের লেখা অসংখ্য বই। এই কক্ষে বসে তিনি জ্ঞান গবেষণা করতেন। তৎকালীন কেন্দ্রীয় কারাগারের ২৬নং সেলে ওনার থাকার কক্ষটিতে যেদিন আমি প্রবেশ করি, তখন আমার কাছে মনে হয়েছে এটি যেন ওনার বাসার স্টাডি রুম।
কক্ষটির এক পাশে শোয়ার বিছানা এবং অপর কোণায় চেয়ার ও পড়ার টেবিল। অধ্যয়নের জন্য তিনি টেবিলের ওপর তাফসির, হাদিসের গ্রন্থ ও বিভিন্ন ইসলামী সাহিত্য সাজিয়ে রেখেছেন। তিনি জ্ঞানচর্চার জন্য সব সময় চেষ্টা করতেন, যা জেলখানার ভেতরেও কমতি করেননি। লেখালেখির কাজও অব্যাহত রেখেছিলেন। জ্ঞানচর্চার এ ধরনের বৈশিষ্ট্য যুগে যুগে দীনের দাঈ ও মুস্তাহিদদের জীবনে লক্ষ করা যায়। শায়খুল ইসলাম ইমাম তাকিউদ্দীন আহমদ ইবনে তাইমিয়ার (রাহি.) জেলজীবন সম্পর্কে জানা যায়, কারাগারে বসেও তিনি লেখনীর কাজ অব্যাহত রেখেছিলেন। তাঁর নিজর্¦লা সত্যের প্রকাশে কারাপ্রাচীর বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বিরোধীপক্ষ হিংসার আগুনে তাঁকে পুড়িয়ে ছারখার করতে চেয়েছিল। তৎকালীন রাজার হুকুমে কারাগারে তাঁর কাছে থেকে বইপত্র, খাতা কলম, কালি দোয়াত সব কিছুই ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল। তবুও তিনি দমে যাননি। ছেঁড়া টুকরো কাগজ জমা করে কয়লা দিয়ে তাতে লিখে রাখতেন। এভাবে সত্যের নির্ভীক বীর সেনানী আমৃত্যু লড়ে যেতে থাকেন অসত্যের বিরুদ্ধে। তাঁর সাতষট্টি বছরের জীবনকাল ছিল মিথ্যা ও বাতিল, অন্যায় ও অসত্যের ন্যক্কারজনক পরাজয়ের ইতিবৃত্ত। এ পথে তিনি কোনো দোর্দণ্ড প্রতাপশালী শাসক ও অসীম ক্ষমতাধর প্রতিপক্ষের রক্তচক্ষুকে একটুও তোয়াক্কা করেননি। আল্লামা সাঈদী ছিলেন এ যুগের এমন একজন সত্যের নির্ভীক বীর সেনানী ও ইসলামি স্কলার, যিনি কারাগারের বন্দীজীবনেও ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে মিথ্যা ও বাতিলের পরাজয়ের কাহিনী লিখে গেছেন। কুরআন ও সুন্নাহ হচ্ছে ইসলামের সত্য জ্ঞানের দুটি মূল উৎস। আল্লামা সাঈদী ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখাকে এ মূল উৎস দুটির সাথে সংযুক্ত করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি তাঁর সব ইলমী যোগ্যতা ও বুদ্ধিবৃত্তিকে ব্যবহার করেছেন। তাঁর লিখিত তাফসিরে সাঈদীসহ অন্য গ্রন্থগুলোর মাঝে এর প্রমাণ মেলে। (চলবে)










