॥ এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ ॥
দ্বিতীয় পর্ব
ছয়
আল্লামা সাঈদী (রাহি.) একজন দাঈ ইলাল্লাহর পাশাপাশি একজন ইসলামী রাজনীতিবিদ ছিলেন। তিনি ১৯৭৩ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। জামায়াতের গঠনতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করে সংগঠনের জনশক্তির সর্বোচ্চ স্তর তথা রুকনিয়াত হাসিল করেন। তিনি পর্যায়ক্রমে কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা, কর্মপরিষদ ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর অগ্রগতি সাধনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক সভা-সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে কর্র্মীদের সাহচর্য দিতেন এবং গঠনমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে তাদের দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করতেন। জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও তাঁর উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ছিল। তিনি তাফসিরের ময়দানে সারগর্ভ আলোচনা ও সুরের সম্মোহনী শক্তি দিয়ে শ্রোতাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে রাখতেন। আবার রাজনৈতিক সমাবেশে স্বল্পসময়ে চমৎকার বক্তব্য উপস্থাপন করে শ্রোতাদের মাঝে জাগরণ তৈরি করতেন। এতে বোঝা যায়, দীনের দাঈর পাশাপাশি বিজ্ঞ রাজনীতিবিদের যোগ্যতাও আল্লাহ তায়ালা আল্লামা সাঈদীকে দিয়েছিলেন। বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন রাজনৈতিক সমাবেশ ও পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত ওলামা-মাশায়েখ সমাবেশ, ভারত কর্তৃক বাংলাদেশের উজানে টিপাই নদীর মুখে বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে অনুষ্ঠিত সমাবেশে তার প্রদত্ত বক্তব্যগুলো ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তার অসংখ্য বক্তব্যের মধ্যে একটি বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, যা শুনে বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক মানুষ এখনো উজ্জীবিত হয়। এ বক্তব্যটি তিনি চট্টগ্রামের আউটার স্টেডিয়াম মাঠে লাখো জনতার সামনে উপস্থাপন করেছিলেন। তৎকালীন আওয়ামী শাসকগোষ্ঠীর রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করে তিনি বলেছিলেন, “বাংলাদেশের ভাগ্যাকাশে উত্তর গগনে কালো মেঘ জমা হয়েছে। ঝড়ের পূর্বাভাস লক্ষ করছি। যদি মোকাবিলা করতে না পারেন সক্ষমভাবে, তাহলে এমন অন্ধকার গাঢ়, কালো, অমাবস্যার রাত আসতে পারে, যার সুবহে সাদিক হওয়া অসম্ভব। আপনারা কি কাপুরুষের মতো কাফের, মুশরিকদের গোলামি করে মরতে চান? বিড়ালের মতো পাঁচশত বছর বেঁচে থেকে লাভ নাই, সিংহের মতো এক ঘণ্টা বাঁচতে চাই।” আওয়ামী লীগের গত ১৫ বছরের শাসনামলে ভিন্নমতের অনুসারী দেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রতি মুহূর্তে তাঁর এ বক্তব্যের প্রতিফলন লক্ষ করছে।
জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কর্তৃক আয়োজিত সমাবেশে আল্লামা সাঈদী অতিথি হিসেবে উপস্থিত হতেন। নব্বইয়ের দশকে বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী একটি সমাবেশের আয়োজন করে। উক্ত সমাবেশে আমরা কয়েকজন মঞ্চের শৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলাম। আল্লামা সাঈদী সাহেব তখন মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন। সেই সময়ের একটি ঘটনা এখনো স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে। সমাবেশ চলাকালীন মঞ্চের সামনে একটি লোকের গতিবিধি ওনার কাছে সন্দেহজনক মনে হয়। তখন তিনি হাতের ইশারায় আমাকে ডেকে নিয়ে বিষয়টি জানালেন। অতঃপর আমরা অত্যন্ত সুকৌশলে কোনোরকম বিশৃঙ্খলা ছাড়াই সন্দেহভাজন লোকটিকে নিরাপদে অন্যত্র সরিয়ে নিতে সক্ষম হই। পরে জানা গেল, সমাবেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ মহলের পক্ষ থেকে লোকটিকে মঞ্চের সামনে পাঠানো হয়েছিল। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ তায়ালার রহমতে সমাবেশটি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়। পরবর্তী সময়ে আল্লামা সাঈদী এর জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন এবং ছাত্র সংগঠনের কর্মীদের দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালনের প্রশংসা করেন। এ ঘটনায় বোঝা যায়, তিনি অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান, বিচক্ষণ ও দূরদর্শী নেতাও ছিলেন, যার শূন্যতা পূরণ হওয়া কঠিন।
আমার ছাত্রজীবনের আরেকটি ঘটনা অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক। ১৯৯১ সালে শিবিরের কেন্দ্রীয় সদস্য সম্মেলন শেষে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তখন আমি ইসলামী ছাত্রশিবিরের চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ে সভাপতির দায়িত্ব পালন করতাম। ঐ অনুষ্ঠানে আমি উপস্থিত ছিলাম। সন্ধ্যার পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পূর্বে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রোধ ও সুস্থধারার সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গুরুত্বের ওপর আলোচনা রাখেন। কেন্দ্রীয় সদস্য সম্মেলনের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘দূর্নিবার’ একটি নাটক মঞ্চস্থ করার প্রস্তুতি নিয়ে মঞ্চে আসে। নাটকের নাম ছিল ‘সুবর্ণপুরের সুবর্ণ দিন’। থিমটি ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তখন হলের চারদিকে শ্রোতাদের উপচেপড়া ভিড়। এরই মধ্যে এশার নামাজের বিরতি হলে মঞ্চের সামনে কালো পর্দা টেনে দেয়া হয়। উপস্থিত দায়িত্বশীলগণ এবং শিল্পীরা মঞ্চে নামাজের জন্য দাঁড়িয়ে যান। নামাজে ইমামতি করেছিলেন আল্লামা সাঈদী। নামাজ শেষে দুর্নিবারের শিল্পীরা সকলে তাঁর সাথে মোলাকাত করে পরিচিত হন। ওনাকে কাছে পেয়ে শিল্পীরা খুশি হন। নামাজের পর তিনি আমাকে সাথে নিয়ে মঞ্চের নিচে সামনের সারিতে বসে নাটক দেখছিলেন। নাটকের একটি দৃশ্য শেষ করে আরেকটি দৃশ্য শুরুর মাঝখানে সামান্য সময় পেলে তিনি আমার সাথে নাটকের কিছু কিছু বিষয়ের ওপর আলোচনা করেছিলেন। নাটকের মধ্যে একজন পণ্ডিত মশাইয়ের চরিত্র ছিল। এ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন দুর্নিবারের দক্ষ অভিনেতা মাসুম। অভিনেতা পণ্ডিত মশাইয়ের মাথা মুণ্ডানো অবয়ব ও বেশভূষা ছিল হিন্দু পণ্ডিতের সাথে অভূতপূর্ব মিল। নাটকের মধ্যে পণ্ডিত মশাইয়ের একটি ডায়ালগ ছিল মঙ্গল, মঙ্গল। অভিনেতার চেহারা, বাচনভঙ্গি এবং ডায়ালগের মাঝে সাদৃশ্য ও চমৎকার পরিবেশনা পুরো অডিয়েন্সকে বিমোহিত করেছিল। নাটকের এ চরিত্রটি নিয়ে তিনিও খুব হাস্যরস করেছিলেন। নাটক শেষ হলে তিনি অভিনেতাকে ডাকার জন্য আমাকে বললেন। অভিনেতা কাছে এলে আল্লামা সাঈদী হাসির ছলে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি কি হিন্দু? এ কথা শুনে অভিনেতা হেসেই বলে ওঠেন না, আমার নাম মাসুম এবং আমি আপনার একজন ভক্ত। এ কথা শুনে তিনি বলেন, আস্তাগফিরুল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ। অতঃপর তিনি মাসুমের চমৎকার অভিনয়ের প্রশংসা করেন এবং মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করেন।
আল্লামা সাঈদী (রাহি.) বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসতেন। তিনি জেলখানার কষ্টকর জীবনেও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কথা বার বার স্মরণ করতেন। আমাদের কাছ থেকে ছাত্রশিবির সম্পর্কে খোঁজখবর নিতেন। শিবিরের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এত গভীর ছিল যে, তিনি কারাগারে বসে শিবিরের জন্য গান লিখেছিলেন-
শিবির আমার প্রাণ
খোদার সেরা দান।
আল্লাহ মেহেরবান,
আল্লাহ মেহেরবান।
ওনার কারাজীবনে লেখা এ গানটি সুর করেছেন শিল্পী বিপ্লব আনোয়ার, যা শিবিরের সংগীতশিল্পীরা মধুর কণ্ঠে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরিবেশন করে শ্রোতাদের উজ্জিবীত করে থাকে।
ছাত্রশিবিরের কার্যক্রম ও নেতা-কর্মীদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে চট্টগ্রামের তাফসির মাহফিলে তিনি বলেছিলেন, “ইসলামী ছাত্রশিবির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ছাত্র অঙ্গনের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বড় নেয়ামত।” তাই তিনি দেশে বিদ্যমান সহশিক্ষার মাঝে ছাত্রদের আদর্শ ও চরিত্রবান মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইসলামী ছাত্রশিবিরের অনন্য অবদানের প্রশংসা করতেন। সেইসাথে অভিভাবকদের নিকট তাদের জন্য দোয়া চাইতেন। তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন সভা-সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে বক্তব্যের মাধ্যমে জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ইসলামের আলোকে জীবন গড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন। কখনো কখনো তাদের নিজের সান্নিধ্যে এনে কুরআনের সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ভূমিকা পালনের জন্য উৎসাহ দিতেন।
সাত
আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী শুধুমাত্র তাফসিরের ময়দানে জনপ্রিয় ছিলেন না, বরং রাজনীতির ময়দানেও অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি পিরোজপুর-১ আসন থেকে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে পরপর দুবার বিজয়ী হয়ে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীও ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী ব্যক্তি। এ নির্বাচনী এলাকা থেকে ওনার পূর্বে আ’লীগের টিকিটে একজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এমপি ছিলেন। একটি হিন্দু অধ্যষিত এলাকা থেকে নির্বাচনে জয়ী হওয়া মোটেও সহজ বিষয় ছিল না। কতটা জনপ্রিয় হলে বার বার নির্বাচিত প্রার্থীকে পরাজিত করা যায়, তা আল্লামা সাঈদী তাঁর এ বিজয়ের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন। তাঁকে শুধু মুসলিম ভোটাররা নয়, বরং এলাকার হিন্দু ভোটাররাও উল্লেখযোগ্য ভোট দিয়ে বিজয়ী করেছিল। এতে প্রতীয়মান হয়, তিনি অমুসলিমদের কাছেও অত্যন্ত প্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর জানাযায় অসংখ্য অমুসলিমের উপস্থিতিতে এর সর্বশেষ প্রমাণ মেলে।
আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী একজন দক্ষ পার্লামেন্টেরিয়ান হিসেবে আইনপ্রণয়নসহ দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন বাংলাদেশের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে তিনি প্রথমবারের মতো অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখন আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ২১ বছর পর জাসদ ও জাপার সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠন করে। প্রধান বিরোধীদল ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। এ সংসদে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সংখ্যা মাত্র ৩ জন হলেও আল্লামা সাঈদী যেন একাই একশ। ৭ম সংসদের বৈরী পরিবেশে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও সাহসী। সংসদ অধিবেশনে তিনি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও ইসলামিক ইস্যুতে তথ্যভিত্তিক ক্ষুরধার বক্তব্য রাখতেন। তাঁর বক্তব্য প্রদানকালে আওয়ামী লীগ ও বামপন্থী সংসদ সদস্যগণ নিছক বিরোধিতার কারণে সংসদে হট্টগোল করলেও তাঁর সাহসী উচ্চারণ স্তব্ধ হতো না। অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় তথ্য-উপাত্ত ও কুরআন-হাদিসের রেফারেন্স দিয়ে যেভাবে তিনি বক্তব্য উপস্থাপন করতেন, যা অনেক প্রবীণ পার্লামেন্টেরিয়ানকে হার মানাতো।
জাতীয় সংসদে দেশ পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ আইন রচিত হয়ে থাকে। আইনপ্রণয়ন ও সংসদের রীতি পরিবর্তনে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (রাহি.) যোগ্যতার সাথে ভূমিকা পালন করেছেন। ব্রিটিশ প্রথার অনুসরণে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতে ২৬৭ (২) ধারা অনুযায়ী একসময় সংসদে প্রবেশ এবং বের হওয়ার সময় সদস্যদের মাথা ঝোঁকাতে হতো। ১৯৯৬ সালে আল্লামা সাঈদী প্রথমবারের মতো সংসদ অধিবেশনে নোটিশ প্রদান করেন। নোটিশে তিনি বলেন, সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপরে পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস হবে আমাদের জাতীয় কার্যাবলীর ভিত্তি। সুতরাং সংসদের কার্যপ্রণালীর বিধি ২৬৭ (২) সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। মাথা ঝোঁকানোর এই শিরকি বিধি চালু থাকলে সংসদের প্রত্যেক সদস্যকে আল্লাহর কাছে অপরাধী হতে হবে। সুতরাং সংসদের এই বিধি অনতিবিলম্বে বাতিল করা হোক। আল্লামা সাঈদীর প্রস্তাবে তৎকালীন সংসদ সদস্যবৃন্দ অনেক আলোচনার পর ঐ বিধি বাতিল করতে বাধ্য হন, যা এখনো কার্যকর আছে। এখন কোনো সংসদ সদস্যকে মাথা ঝুঁকিয়ে সংসদে ঢুকতে বা বের হতে হয় না। সালাম দিয়ে যাওয়া-আসা করা যায়। এ নিয়ম আল্লামা সাঈদী সাহেবের মাধ্যমেই সংসদে প্রতিস্থাপিত হয়েছে।
ইসলামে মদ-জুয়া হারাম। বাংলাদেশে মদ ও জুয়া নিষিদ্ধের দাবিতে মদ ও জুয়া নিষিদ্ধ আইন ১৯৯৬ নামে একটি বিল আল্লামা সাঈদী জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন। তৎকালীন আওয়ামী সরকার প্রায় আড়াই বছর এ বিলটি সংসদীয় কমিটিতে ঝুলিয়ে রাখে। সংসদে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মদ ও জুয়া নিষিদ্ধের বিলটি জাতীয় সংসদে পাস করেনি। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের এই দেশে আজও মদ ও জুয়া নিষিদ্ধ হয়নি। বরং বর্তমান ভোটবিহীন জাতীয় সংসদ জনমতের তোয়াক্কা না করে প্রতি একশজনের জন্য মদের লাইসেন্স প্রদানের আইন পাস করে ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
আল্লামা সাঈদী ২০০১ সালে দ্বিতীয় দফায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে অষ্টম জাতীয় সংসদের শেষের দিকে ২০০৬ সালের ২৯ আগস্ট তারিখে কওমি সনদের স্বীকৃতির ওপরে বিল উত্থাপন করেন। জাতীয় সংসদে আল্লামা সাঈদী সাহেবের উত্থাপিত এ বিলের পরিপ্রেক্ষিতে দাওরায়ে হাদিসকে ইসলামিক স্টাডিজ, অ্যারাবিক লিটারেচারকে গ্র্যাজুয়েশন সমমান এবং ডিগ্রিধারীদের সরকারি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়া সংক্রান্ত একটি নোটিফিকেশন জারি করেছিল তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকার, যা পরবর্তীতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর তারিখে গেজেট আকারে প্রকাশ হয়। কওমি শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা ও আলেমদের মধ্যে দ্বিমত থাকায় এ বিলের ফলাফল কার্যকর করতে কিছুটা বিলম্ব হয়। অধিকন্তু সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ায় এবং গেজেট প্রকাশের পরও এ বিল কার্যকরী করা যায়নি। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী সরকারের চতুর প্রধানমন্ত্রী কওমি সনদের স্বীকৃতির পুরো কৃতিত্ব আওয়ামী সরকারের বলে জোর গলায় দাবি করে বসেন। অথচ আল্লামা সাঈদী সর্বপ্রথম যেই নোটিশ দিয়েছিলেন, তা কার্যকর করার জন্য গেজেট প্রকাশ করা হয়েছিল। কওমি শিক্ষার সরকারি স্বীকৃতি প্রদানের পেছনের ইতিহাস চরমভাবে বিকৃত করে ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত এক সমাবেশে শেখ হাসিনা কওমি জননীর উপাধিতে ভূষিত হন এবং এর পুরো কৃতিত্ব নিজেদের পক্ষে নেয়ার অপকৌশল গ্রহণ করেন, যা জাতির কৃতিসন্তান ও গুণিজনের অবদানকে অস্বীকার করার শামিল।
অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর তিনি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অবর্তমানে সংসদ অধিবেশনে কখনো কখনো স্পিকারের চেয়ারে বসে যোগ্যতার সাথে সংসদ পরিচালনা করেছেন। তাছাড়া একাধিক মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সভাপতির দায়িত্বও তিনি সফলতার সাথে পালনের মাধ্যমে দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (রাহি.) জনগণের কল্যাণে তাঁর নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছেন। তাঁর উন্নয়ন কার্যক্রম ছিল দৃশ্যমান ও আলোচিত। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে কেন্দ্রীয় অফিসে আলাপকালে বলতে শুনেছি, ‘এ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর যত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের মধ্যে আল্লামা সাঈদী সাহেব সবচেয়ে বেশি উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন।’ তিনি অত্যন্ত সচ্ছতার সাথে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে জনগণের সুনাম অর্জন করেছিলেন। তাছাড়া বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় অসংখ্য মসজিদ, মাদরাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। তাঁর এ অবদান ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের নিকট সমাদৃত হয়েছে। তাঁর উন্নয়ন কার্যক্রমের সুফল ভোগ করছেন নারী-পুরুষ, মুসলিম-অমুসলিম ও দল-মত নির্বিশেষে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ। এলাকার মানুষ তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা আল্লামা সাঈদীর নিকট অনায়াসে বলতে পারতেন। তিনি সকলের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতেন। এক্ষেত্রে কোনো ভেদাভেদ করতেন না। অমুসলিমরাও তাঁর কাছে যথাযথ গুরুত্ব পেতেন। তার এলাকার হিন্দুরা বিভিন্ন সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘আমরা দরিদ্র ও অসহায় ছিলাম। সাঈদী হুজুরের মতো একজন ভালো মানুষ এম.পি হওয়ার পর আমরা তাঁকে সুখে-দুঃখে কাছে পেয়েছি। আমাদের পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তিনি অংশগ্রহণ করতেন এবং আর্থিক অনুদান দিতেন। তিনি সংসদ সদস্য থাকাকালীন এলাকায় কোনো প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ ও রাজনৈতিক হানাহানি ছিল না। এ সময়ে আমরা মায়ের কোলের শিশুর মতো নিরাপদে জীবনযাপন করেছি।’
আট
বাংলাদেশে ইসলামের প্রচার-প্রসার, সমাজ ও রাজনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর (রাহি.) যোগ্যতা ও বহুমুখী প্রতিভার খ্যাতি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি ইসলামের পরিচয় সঠিকভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে মানুষকে ইসলামী আন্দোলনের পথে ধাবিত করার কারণেই ইসলামবিরোধী শক্তি শঙ্কিত হয়ে যায়। তারা বুঝতে পেরেছিল, আল্লামা সাঈদীর দাওয়াহ্ কার্যক্রম ও রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ করা না গেলে বাংলাদেশে ইসলামী পুনর্জাগরণ আন্দোলন দিন দিন শক্তিশালী হয়ে উঠবে। তাই তারা নানা অপকৌশল ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাঁকে প্রতিহত করার অপচেষ্টা চালায়। তাঁর মর্যাদা ও খ্যাতি ক্ষুণ্ন করার জন্য একশ্রেণির মিডিয়ার মাধ্যমে সুপরিকল্পিতভাবে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে। কিন্তু জনগণের মাঝে এর বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারেনি। ইসলামবিরোধী শক্তির এ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে তারা রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে আল্লামা সাঈদীকে মিথ্যা মামলা দিয়ে রাজনৈতিকভাবে ফাঁসানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১০ সালের ২১ মার্চ বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশনের মহাসচিব সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরীকে দিয়ে কথিত ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অজুহাতে ঢাকার জজ কোর্টে একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করে। আরেকটি মামলা লালমনিরহাটে দায়ের করে জনৈক আওয়ামী লীগের নেতা এডভোকেট মতিয়ার রহমান। দুটি মামলায় একই অভিযোগ আনা হয়েছে। দায়েরকৃত কথিত মামলায় ঐ বছর ২৯ জুন রাজধানীর শহীদবাগের নিজ বাসা থেকে পুলিশ আল্লামা সাঈদীকে গ্রেফতার করে। পুলিশ যখন তার বাসভবনে যায়, তখন তিনি সেখানে ছিলেন না। পাশে ভাইয়ের বাড়িতে অসুস্থ মাকে দেখতে গিয়েছিলেন। বাসায় পুলিশ হানা দিয়েছে এ খবর শোনামাত্র আল্লামা সাঈদী তৎক্ষণাৎ নিজ বাসায় ফিরে আসেন। তখন পুলিশ তাকে বিনা বাধায় আটক করতে সক্ষম হয়। একই দিন সেই মামলায় জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমীর ও সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ সাহেবকেও গ্রেফতার করা হয়। পরদিন সিএমএম কোর্টে হাজির করানোর সংবাদ পেয়ে আমরাও সেখানে উপস্থিত হই। ঐ দিন আদালতে একটি অমানবিক দৃশ্য স্মরণ হলে এখনো নিজেকে অসহায় মনে হয়। ওনারা তিনজনই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। সেই হিসেবে দেশের প্রচলিত আইন ও রাজনৈতিক শিষ্টাচার অনুযায়ী যে প্রটোকল পাওয়ার কথা ছিল, তা লঙ্ঘন করে। সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে ওনাদের অপমানজনকভাবে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। শুধু তাই নয়, সরকারদলীয় সন্ত্রাসী বাহিনী ও আইনজীবীদের মাধ্যমে আদালত প্রাঙ্গণে ত্রাস সৃষ্টি করা হয়। এ পরিস্থিতিতে আইনজীবীদের সাথে নিয়ে আমরা আদালতের কক্ষে প্রবেশ করলে একটি লোমহর্ষক দৃশ্য চোখে পড়ে। আদালতের এক পাশে লোহার শিকের জিঞ্জিরে আবদ্ধ খাঁচায় কুরআনের পাখি আল্লামা সাঈদী, সাবেক আমীরে জামায়াত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী এবং সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। শত শত আইনজীবীর ভিড় অতিক্রম করে খাঁচার সামনে উপস্থিত হয়ে আমি তিনজনকে সালাম দিয়ে মোলাকাত করার চেষ্টা করি। সেখানে সরকারদলীয় উচ্ছৃঙ্খল আইনজীবীরা বাধার সৃষ্টি করলে কিছুটা বাকবিতণ্ডা হয়। তখন আমি জাতীয় সংসদ সদস্য ছিলাম। তাদের মধ্যে একজন আমাকে চেনার পর সামনে এগিয়ে আসেন। এর মধ্যে বিচারক সবাইকে শান্ত হওয়ার আদেশ দেন। তখন আমি ভারাক্রান্ত হৃদয়ে খাচার সাথে দাঁড়িয়ে আমার তিনজন শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় নেতাকে সালাম প্রদান করলে তাঁরা হাসিমুখে জবাব দেন। এরপর ওনাদের খোঁজখবর নেয়ার চেষ্টা করি। আলাপচারিতায় ওনাদের শক্ত মনোবল ও ঈমানী দৃঢ়তা দেখে আমি অভিভূত হই। নেতৃবৃন্দের গ্রেফতারের পর থেকে আমরা উদ্বিগ্ন ছিলাম। কিন্তু আমাদের মজলুম নেতাদের মাঝে এর লেশমাত্র পরিলক্ষিত হয়নি। কিছুক্ষণ পর আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে আইনজীবীগণ ওনাদের জামিনের আবেদন করলে শুনানির পর ধর্মীয় অনুভূতির মামলায় আটকৃত উপস্থিত সকলকে জামিন দেয়া হয়। জামিনের আদেশ শুনে আমরা সবাই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি। তবে মনের মধ্যে এক অজানা আশঙ্কা কাজ করছিল। কিছুক্ষণ পর সত্যিই তা ঘটে গেল। বিচারক আরেক আদেশে তাঁদের তিনজনকে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন থানায় দায়েরকৃত তথাকথিত যুদ্ধাপরাধ মামলায় শ্যোন এরেস্ট দেখিয়ে জেলখানায় প্রেরণের আদেশ প্রদান করেন। এ সময় আদালত কক্ষে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। সকলের চোখে-মুখে পানি। কেউ এ অন্যায় আদেশ ও মিথ্যা মামলা মেনে নিতে পারছিল না। তিনজনেই বয়োবৃদ্ধ ও অসুস্থ এবং নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন। এমতাবস্থায় বন্দি জীবন ছিল তাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর ও অমানবিক। এই তিন শীর্ষনেতা সারা জীবন দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও মানুষের কল্যাণে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। শুধুমাত্র ইসলামের পথে জীবনযাপন ও এদেশে কুরআনের সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়ার অপরাধে তাদের কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে প্রেরণ করা হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আর তারা তাদেরকে নির্যাতন করেছিল শুধুমাত্র এ কারণে যে, তারা মহাপরাক্রমশালী প্রশংসিত আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল। (সূরা বুরূজ : ৮)। (চলবে)









