আজ থেকে ১৬ বছর আগে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় রচিত হয়। ২৮ অক্টোবর ছিল তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন। এ উপলক্ষে সেদিন বিকালে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপির সমাবেশ ডাকা হয়েছিল। সন্ধ্যাবেলা ছিল বঙ্গভবনে ক্ষমতা হস্তান্তরের আয়োজন। শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় বাধা দেয়ার জন্য তৎকালীন প্রধান বিরোধীদল আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ১৪ দলীয় জোটের নেতা লগি-বৈঠা, লাঠি নিয়ে বঙ্গভবন ঘেরাওয়ের জন্য সারা দেশের নেতা-কর্মীদের পল্টন ময়দানে জমায়েত হওয়ার ঘোষণা দেন। আইনের দৃষ্টিতে তার এ ঘোষণা ছিল সম্পূর্ণ অবৈধ।
তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতার নির্দেশ অনুযায়ী সকাল থেকে লগি-বৈঠা, লাঠি, পিস্তল, বোমাসহ নানা ধরনের অবৈধ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের নেতা-কর্মীরা পল্টন এলাকায় আসতে থাকে। তখন বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের কিছুসংখ্যক কর্মী মঞ্চ তৈরির কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তখন আনুমানিক সকাল ৯টায় আমরা কয়েকজন মঞ্চ তৈরির কাজে সহযোগিতা করার জন্য মহানগরী অফিস থেকে উত্তর গেটে গিয়ে পৌঁছি। এ সময় উত্তেজনাপূর্ণ ¯স্লোগানের শব্দ শুনে আমরা পল্টন মোড়ের দিকে এগিয়ে যাই। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ একটি ইটের টুকরা এসে আমার ডান হাতের কব্জিতে প্রচণ্ডভাবে আঘাত করে। সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে সামনে গিয়ে দেখলাম, প্রেস ক্লাবের রাস্তা হয়ে লগি-বৈঠাসহ নানা ধরনের অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত একটি মিছিল এবং বিজয়নগর রোড হয়ে একই ধরনের আরেকটি সশস্ত্র মিছিল উত্তর গেটের দিকে এগিয়ে আসে। একই সময়ে মুক্তাঙ্গনে অবস্থানরত আওয়ামী যুবলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা উত্তর গেটের দিকে অগ্রসর হয়। তারা প্রকাশ্যে গুলি করা ছাড়াও লগি-বৈঠা নিয়ে জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। একের পর এক আঘাত হানতে থাকে নিরীহ জামায়াত ও শিবিরের কর্মীদের ওপর। মঞ্চ গুঁড়িয়ে দিতে এগিয়ে যেতে থাকে বায়তুল মোকাররম উত্তর সড়কের দিকে। তাদের অসৎ উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে সেখানে উপস্থিত জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের নিরস্ত্র নেতা-কর্মীরা প্রতিরোধ গড়ে তুললে আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা বর্বর হামলা চালায়। এ হামলায় জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের নিরস্ত্র কর্মীদের অনেকে আহত হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়লে সহকর্মীরা তাদের উদ্ধার করে মহানগরী অফিসে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। তাদের কারো মাথা ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। রক্তের স্রোতে মুখমণ্ডল ভিজে গিয়ে পুরো শরীর যেন রক্তাক্ত এক জনপদ। সন্ত্রাসীদের হামলায় তরুণ, যুবক, বৃদ্ধ কেউ রেহাই পাননি। কেউ কেউ কাতরাতে কাতরাতে ঢাকা মহানগরী অফিসে গিয়ে মাথায় ও হাতে ব্যান্ডেজ বেঁধে সভামঞ্চ রক্ষার জন্য পুনরায়
পল্টন মোড়ে যোগ দেন এবং আওয়ামী সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করার জন্য মানবপ্রাচীর গড়ে তোলেন।
সেদিন পল্টন মোড় ও এর পার্শ্ববর্তি এলাকায় দীর্ঘ প্রায় ৮ ঘণ্টা যাবত লগি-বৈঠা বাহিনীর নারকীয় হামলা চলে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের কর্মীদের ওপর। হামলা চলাকালে পিস্তলসহ বিভিনড়ব ধরনের অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আওয়ামী লীগের এক নেতা, যিনি ডাক্তার এবং সাবেক সংসদ সদস্য তার বাহিনী নিয়ে যোগ
দেন। পল্টন মোড় থেকে একটু এগিয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) অফিসের সামনে তার অনুগত একদল যুবককে হাত নেড়ে সামনে যাওয়ার নির্দেশ দেন। ঐ নেতা হাত নেড়ে নির্দেশ দেয়ার পরই এক যুবককে ঘেরাও করে লগি-বৈঠা বাহিনী নির্মমভাবে পেটাতে থাকে। চতুর্দিক থেকে আঘাতে আঘাতে সে পড়ে যায় রাস্তার কিনারে। সাপের মতো লগি-বৈঠা দিয়ে তাকে পেটানো হয়। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তার লাশের ওপর উঠে নারকীয় উল্লাস করে লগি-বৈঠা বাহিনী। যেখানেই দাড়ি-টুপিধারী মানুষ দেখেছে, তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে তারা। তাদের পৈশাচিক হামলায় নিহত হয়েছিল ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম, সাথী গোলাম কিবরিয়া শিপন ও সাইফুল্লাহ মুহাম্মদ মাসুম, জামায়াতে ইসলামীর কর্মী হাবিবুর রহমান, জসিম উদ্দীন (লালবাগ) ও জসিম উদ্দিন (যাত্রাবাড়ী) এবং আহত হয়েছিল হাজারেরও অধিক লোক।
পল্টন মোড়ে ব্যর্থ হয়ে সন্ত্রাসীরা একপর্যায়ে বিকল্প পথে মঞ্চ দখলের জন্য বিজয়নগর ও পল্টন মসজিদের গলি দিয়ে ঢুকে নিরীহ জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীদের বেধড়ক পেটাতে থাকে। এ সময় সন্ত্রাসীরা শিবির নেতা মুজাহিদুল ইসলামকে কস্তুরী হোটেলের পেছনে একা পেয়ে তাকে লক্ষ করে গুলি করে। গুলির আঘাতে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মুজাহিদ। তারপর লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, মৃত লাশকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নিজেদের জিঘাংসা চরিতার্থ করে। লালবাগের জসিম উদ্দিনকে প্রীতম হোটেলের সামনে একাকী পেয়ে লগি-বৈঠা দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। তিনি বাঁচার জন্য বার বার উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করেন। কিন্তু মানবরূপি পাষণ্ডরা তাকে সেখানে নির্মমভাবে হত্যা করে। এ করুণ দৃশ্য টিভি চ্যানেলগুলোয় দেখানো হয়। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মানবতাবিরোধী অপরাধ এদিনই সংঘটিত হয়েছিল।
সন্ত্রাসীদের মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ, বোমা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের পর আহতদের সারি বেড়েই চলছিল। আহতদের প্র মে নিয়ে যাওয়া হয় জামায়াতের ঢাকা মহানগরী অফিসে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। গুরুতর আহতদের নগরীর বিভিনড়ব হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এ সময়ে সন্ত্রাসীরা রাস্তার দুই পাশে থাকা
গরিব হকারদের দোকানগুলো আগুনে পুড়িয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে। নিরীহ জনগণ বার বার পুলিশকে অনুরোধ করলেও তারা রাস্তার পাশে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। অনেক পুলিশকে সেদিন বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর চত্বরের ভেতরে অবস্থান নিতে দেখা যায়। দুপুর পৌনে ২টার দিকে ১৪ দলের লগি-বৈঠাধারী
সন্ত্রাসীরা হামলা জোরদার করে পল্টন মোড় থেকে সিপিবির অফিসের সামনে চলে আসে। এ সময় তারা বিচ্ছিনড়ব হয়ে পড়া কয়েকজন জামায়াত ও শিবিরের নেতা-কর্মীদের ধরে নিয়ে যায়। পুলিশ কাছে দাঁড়িয়ে থাকলেও তারা কোনো ভূমিকা পালন করেনি। একই সময় বিজয়নগর, পুরানা পল্টন মসজিদ গলিসহ
আশপাশের এলাকা দিয়ে চোরাগুপ্তা হামলা চালাতে থাকে। সেই সকাল থেকে বিরামহীন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়ে দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে যায়। জোহর ও আসরের নামাজ রাস্তায় আদায় করি। দুপুরের খাবারের যেন কোনো চিন্তাই নেই কারো। সে এক বিস্ময়কর দৃশ্য। সবার চিন্তা একটাই বিকালের জনসভা সফল করতে
হবে। সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করতে হবে। অতঃপর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বায়তুল মোকাররমের উত্তর সড়কে জামায়াতে ইসলামীর সমাবেশ শুরু হয়। এ সময় বিজয়নগরসহ অন্যান্য এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে চোরাগুপ্তা হামলা চালাতে থাকে লগি-বৈঠা বাহিনী। তবে সমাবেশ চলতে থাকে স্বাভাবিকভাবে।
সকল নেতার বক্তব্য ছিল স্বাভাবিক এবং ছিল না কোনো উত্তেজনাকর বক্তব্য। যথারীতি আসর নামাজের বিরতির পর পুনরায় সমাবেশ শুরু হয়। তখন বক্তব্য দিতে দাঁড়ান জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী। তার বক্তব্য শুরু হওয়ার ৪-৫ মিনিট পর ৪টা ৪৩ মিনিটে পল্টন মোড়ে উত্তেজনা দেখা যায়। এ সময় নির্মাণাধীন র্যাংগস টাওয়ারের (বাসস ভবনের পূর্ব পাশের বিল্ডিং) ছাদ থেকে সমাবেশ লক্ষ করে ১০-১২টি বোমা ও প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে দফায় দফায় গুলি ছোড়ে ১৪ দলের সন্ত্রাসীরা। এ সময় পুলিশ নিজেদের নিরাপদ স্থানে হটিয়ে নেয়। আবার শুরু হয় ১৪ দলের মরণ কামড়ের মতো আক্রমণ। সমাবেশ ভণ্ডুল করে দেয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে তারা। তথাপি সমাবেশ সফলভাবেই শেষ হয়। মাগরিবের আজানের পর বিডিআর পল্টন মোড়ে অবস্থান নেয়, এরপর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়ে আসে।
সেদিন সন্ত্রাসীরা জামায়াত কর্মী হাবিবুর রহমানকে পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি; লাশটি টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিল গুম করার জন্য। কিন্তু পুলিশের সহায়তায় যখন লাশটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলো, সেখানেও চলতে থাকে এক আওয়ামী লীগ নেতার লাশ দখলের খেলা। তারা নকল বাবা-মা সাজিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিল লাশটি। পরবর্তীতে এ কারসাজি ধরা পড়ায় নকল বাবা-মা সটকে পড়ে। এখানেই শেষ নয়। আওয়ামী লীগ হাবিবুর রহমানকে নিজেদের কর্মী দাবি করে তার লাশের ছবি ব্যবহার করে পোস্টারও ছেপেছিল। লাশ নিয়ে রাজনীতি এর চেয়ে জঘন্য নমুনা আর কী হতে পারে?
সেদিন জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর সন্ত্রাসীরা লগি-বৈঠা, লাঠি, পিস্তল ও বোমা হামলা চালিয়ে যেভাবে মানুষ খুন করেছে, তা মনে হলে আজও শিউরে ওঠে সভ্য সমাজের মানুষ। সাপের মতো পিটিয়ে মানুষ মেরে লাশের ওপর নৃত্য উল্লাস করার মতো ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন। এ ঘটনার পৈশাচিক দৃশ্য দেখে দেশের মানুষ ধিক্কার দিয়েছে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলীয় রাজনীতির প্রতি। মানুষ হত্যা করে লাশের ওপর নৃত্য করার দৃশ্য দেখে অনেকে সংজ্ঞা হারিয়েছেন, অনেকে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। এমনকি ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখে ঢাকাস্থ অনেক কূটনৈতিক চোখের পানি ফেলেছেন এবং রাজনীতির নামে নৃশংসতার তীব্র নিন্দা করেছেন। শুধু বাংলাদেশেই নয়, গোটা বিশ্বের বিবেকবান মানুষের হৃদয় নাড়া দিয়েছে। জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব থেকে শুরু করে সারা বিশ্বে ওঠে প্রতিবাদের ঝড়। ঘটনার পরদিন পল্টন থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছিল। মামলায় আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের ৪০ নেতার নামসহ সহস্রাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। ২০০৭ সালের ১১ এপ্রিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভাপতিকে পলাতক আসামি হিসেবে উল্লেখ করে ৪৬ আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। চার্জশিট দাখিলের পর ২২ এপ্রিল ২০০৭ তারিখে মামলার চার্জশিট গ্রহণ করেন মহানগর হাকিম মীর আলী রেজা। চার্জশিট গ্রহণ করেই আদালত পলাতক আসামিসহ অন্যদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। পরদিন ২৩ এপ্রিল তদন্ত কর্মকর্তার নাটকীয় আবেদনের প্রেক্ষিতে পরোয়ানা স্থগিত করে মামলাটি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন মহানগর হাকিম মীর আলী রেজা। সেই থেকে অধিকতর তদন্তের নামে তিন বছর পার করে দেয়া হয়।
অতঃপর সেদিনের পৈশাচিক ঘটনার বিচার তো দূরের কথা, ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর রাজনৈতিক বিবেচনায় ১৭ আগস্ট মামলাটি সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেয়। আইন অনুযায়ী যেকোনো হত্যা মামলা বাদীর সম্মতি ছাড়া প্রত্যাহার করার সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও মহাজোট সরকার তাই করেছে। আইন বিশেষজ্ঞগণ বলেছেন, কোনো হত্যাকাণ্ডের মামলাই রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করার সুযোগ নেই। যদি কোনো ব্যক্তিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত করা হয়েও থাকে তদন্ত শেষে আদালতই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। তারা বলেন, এ মামলা প্রত্যাহার করার মাধ্যমে মানুষের বিচার পাওয়ার অধিকারও কেড়ে নেয়া হলো। শুধু তাই নয়, হত্যার রাজনীতিকে উৎসাহিত করা হয়েছে। এর পরিণতি কারো জন্যই শুভ নয় উল্লেখ করে তারা বলেন, সরকার নিজের দলের সন্ত্রাসীদের বিচার না করে প্রমাণ করেছে, তারাই সন্ত্রাসীদের মদদ দিচ্ছে। তারা অপরাধীদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে মূলত আইনের শাসনকে নির্বাসনে পাঠিয়ে হত্যাকারীদের আরো উসকে দিচ্ছেন।
দীর্ঘসময় পার হওয়ার পরও কোনো বিচার না হওয়ায় শহীদ মাসুমের মা শামসুনড়বাহার রুবি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়, সবাইকে আইন মানতে হবে। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে তাদের বিরুদ্ধে করা সব মামলা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। তবে আমি আশা ছাড়িনি। এর বিচার একদিন না একদিন হবেই। শহীদ গোলাম কিবরিয়া শিপনের মা মাহফুজা বেগম বলেন, মানুষকে আর যেন এভাবে সাপের মতো পিটিয়ে হত্যা করা না হয়। আর যেন সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে না হয়। শহীদ জসিমের স্ত্রী নারগিস আক্তারের একটাই কথা, বিচার কার কাছে চাইবো। জালেম কখনো এর বিচার করতে পারে না। আর এ সরকার যতদিন আছে, তার বিচার হবে না। তবে দেশ ও জাতির স্বার্থেই এ ঘটনার রহস্য উদঘাটন, দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং নেপথ্য নায়কদের খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডটি ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত। যার পেছনে টার্গেট ছিল প্রমত, জামায়াতে ইসলামীকে দুর্বল করার লক্ষ্যে সেই দিনের সমাবেশ পণ্ড করা এবং সশস্ত্র হামলা চালিয়ে নেতৃবৃন্দকে হত্যার মাধ্যমে জামায়াতকেই নেতৃত্বশূন্য করা। দ্বিতীয়ত, চারদলীয় জোট সরকারের শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় বাধা তৈরি করে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি এবং ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচন বানচাল করা। কারণ সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের পরাজয় হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তৃতীয়ত, বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য গণতন্ত্র, সুশাসন এবং অর্থনীতিকে ধ্বংস করা। সর্বোপরি মানুষের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অধিকারসহ মৌলিক অধিকার খর্ব করে দেশে একটি কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। এ পৈশাচিক ঘটনার উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, ২৮ অক্টোবরের লগি-বৈঠার অবৈধ আন্দোলনের পথ ধরেই ১/১১-এর ঘটনা ঘটে। টানা ২বছরের জন্য সেনাসমর্থিত অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা দখল করে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, ইসলামী মূল্যবোধ ও জাতীয় ঐক্য ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। এর পথ ধরেই বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার টানা ১৪ বছর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলে রেখে দেশে কার্যত কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করে রেখেছে। দেশে আজ গণতন্ত্র নেই, সুশাসন নেই, নেই মানবাধিকার। মানুষের ভোটের অধিকার ও কথা বলার স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয়েছে। রাজনৈতিক দমন-নিপীড়ন, গুম-খুন, জেল-জুলুম ও হত্যার মাধ্যমে দেশে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার নীলনকশার অংশ হিসেবে দেশের সর্ববৃহৎ ইসলামী সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর ওপর চালানো হচ্ছে অমানবিক দমন-নিপীড়ন। জামায়াতে ইসলামীকে নেতৃত্বশূন্য ও নির্মূল করার উদ্দেশ্যে শীর্ষনেতাদের অন্যায়ভাবে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে। এমনকি দেশের আলেম সমাজও তাদের রোষানল থেকে রেহাই পায়নি। দুর্নীতি ও লুটপাটের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। দ্রব্যমূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। দেশে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সরকার ও সচেতনমহল দেশে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা করছে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ ধ্বংসের মুখোমুখি। আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি, মাদক, সন্ত্রাস, ধর্ষণ, নৈতিক অবক্ষয় দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিপথগামী করে চলছে। দেশের এহেন হতাশাব্যঞ্জক অবস্থার কারণ হলো জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় না থাকা।
এমতাবস্থায় ২৮ অক্টোবর ২০২২ এর ১৬ বছর পূর্তিতে দেশের জনগণ কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা থেকে মুক্তি চায়। জনগণ তাদের ভোটাধিকার, মৌলিক অধিকার ফিরে পেতে চায়। মানুষ যথাযথ মর্যাদা নিয়ে সুখেশান্তিতে ও নিরাপদে বসবাস করতে চায়। চায় না কোনো হানাহানি, প্রতিহিংসা, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও রাজনীতির নামে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের মতো পাষণ্ডতার উল্লাস। বিভেদ-বিভাজন নয়, জাতীয় স্বার্থে ঐক্যের বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যে বর্তমান ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী নেতৃত্ব এবং তার সরকারের পতন ঘটিয়ে কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। পল্টন ট্র্যাজেডির নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পথ ধরেই বাংলাদেশে বর্তমানে ফ্যাসিবাদী শক্তি জাতির ঘাড়ে চেপে বসেছে। এবারের ২৮ অক্টোবরে সেই দিনের সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যবিরোধী চেতনা এবং শাহাদাতের প্রেরণা নিয়ে দেশ-জাতি ও দেশের মানুষকে মুক্ত করতে হবে।
লেখক : সাবেক সদস্য, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ।










