১৩ এপ্রিল, ২০২১ সাল। দুপুর বেলা যোহরের নামাজের প্রস্তুতি নেয়ার সময় খবর এলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর ও কঠিন সময়ের কান্ডারী মজলুম জননেতা মকবুল আহমদ মহান রবের ডাকে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর মৃত্যু সংবাদে মুহুর্তের মাঝে শোকের ছায়া নেমে আসে দেশ-বিদেশে সর্বত্র। অনলাইন ও সোস্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন মহলের শোক বাণী ও অসংখ্য মানুষের আবেগ জড়িত বক্তব্য ও মন্তব্য সকলকে কান্নার সাগরে ভাসিয়ে দেয়। এ যেন স্বজন হারানোর প্রচন্ড বেদনা।
গণমানুষের নেতা মরহুম মকবুল আহমদ ছিলেন একজন মুত্তাকী ও উন্নত মানের দ্বীনের দা’ঈ এবং সৎ, সাহসী ও প্রতিভাবান রাজনীতিবিদ। সেইসাথে একজন ধৈর্য্যশীল, শান্ত-শিষ্ট, বিনয়ী-ভদ্র, উদার, পরোপকারী, নিরহংকার ও নির্মোহ ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন ধনী-গরিব, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও সংগঠনের ভিতরে বাহিরে জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের প্রিয় ও একজন আদর্শ মানুষ। তাঁর আচার-আচরণ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট ছিল মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে বর্ণীত মুমিন বান্দার গুণাবলী এবং সাহাবা চরিত্রের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। তাঁর অমায়িক ব্যবহার ও মায়াবী চেহারার তাকওয়ার উজ্জ্বল ছাপ মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর প্রিয় বান্দার সান্নিধ্যে আসার অনুভূতি জাগ্রত করত। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই এবং কোন দিন এ পৃথিবীতে ফিরে আসবেন না। তাঁর হুসনে খালকের (সৎ চরিত্র) সাক্ষী দিচ্ছে আজ অসংখ্য মানুষ ও ইসলামী আন্দোলনের কর্মীগণ। তাঁর প্রশান্ত আত্মা কুরআনের ভাষায় ঘোষণা করছে- “হে প্রশান্ত আত্মা চলো তোমার রবের দিকে, এমন অবস্থায় যে, তুমি (নিজের ভালো পরিণামের জন্য) সন্তুষ্ট (আর তোমার রবের নিকট) পছন্দণীয়। তুমি আমার প্রিয় বান্দাহদের মধ্যে শামিল হয়ে যাও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ কর” (সুরা- আল ফাযর ২৭-৩০ )।
প্রিয় নেতা মকবুল আহমদ ছিলেন আল্লাহর মকবুল বান্দা, অর্থাৎ তাঁর নামের সার্থক পরিচয়। জাতীর এ সাহসী সন্তান ও বর্ণাঢ্য রাজনীতিবিদ ফেনী জেলার দাগনভূঞার সিলোনিয়া গ্রামে ১৯৩৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নিজ এলাকায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করার পর ফেনী কলেজে ভর্তি হন এবং এ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও ১৯৬২ সালে বি.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি কর্মজীবনে একজন আদর্শ শিক্ষক ছিলেন। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত দাগনভূঞা শরিষাদি উচ্চ বিদ্যালয় ও ফেনী সেন্ট্রাল উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। অত:পর ১ বছর ফেনী মহকুমার দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার নিজস্ব সংবাদদাতা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই মরহুম মকবুল আহমদ রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ছাত্র জীবন শেষ করে ১৯৬২ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন এবং ১৯৬৬ সালে জামায়াতের সদস্য (রুকন) হন। অত:পর ফেনী শহর, মহকুমা ও বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার আমীরসহ জামায়াতের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সাল থেকে ২০১০ সালের জুন পর্যন্ত তিনি পর্যায়ক্রমে জামায়াতের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সেক্রেটারী, সহকারী সেক্রেটারী ও নায়েবে আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১০ সালের জুন মাসের শেষ দিকে জামায়াতের তৎকালীন আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত আমীর নিযুক্ত হন। অত:পর দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য গঠিত ২০ দলীয় জোট গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর জামায়াতের আমীর নির্বাচিত হন। ঐ সময় থেকে ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর পর্যন্ত দেশের কঠিনতম পরিস্থিতিতে জামায়াতের আমীর ও ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা হিসাবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সরকারের স্বৈরাচারী আচরণের প্রতিবাদ, জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার, এদেশে ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং গণমানুষের আধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। তিনি দলীয় ও জোটবদ্ধ রাজনীতির পাশাপাশি জাতির সেবার উদ্দেশ্যে ১৯৭০ সালে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে ফেনী সদর ও সোনাগাজী আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী হিসাবে এবং ১৯৮৬, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের নির্বাচনে ইর্ষণীয় প্রতিদ্বন্দীতা করে গণমানুষের নেতা ও সেবক হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন।
সাবেক আমীরে জামায়াত মকবুল আহমদের সাথে ছাত্রজীবন থেকেই আমার পরিচয়। দীর্ঘদিন তাঁকে জানার ও কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। তাঁর উপর আমীরে জামায়াতের দায়িত্বে আসার পর সরাসরি একসাথে কাজ করার সৌভাগ্যও হয়েছে। তাঁকে আমি কাছ থেকে যেভাবে দেখেছি এর প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, একজন তাকওয়াবান নিরব সংগঠক, আদর্শ নেতা, দ্বীনের দা’ঈ ও সমাজ সেবকের সকল মানদন্ডে তিনি উত্তীর্ণ। সর্বদা সংগঠনের সকল বিষয়ে এতবেশী চিন্তা-ভাবনা করতেন দায়িত্বের পেরেশানী যেন তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াত। জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ে রাজনৈতিক কারণে দীর্ঘদিন নিজ বাসায় থাকতে পারেননি। ২০১৪ সালে চরম প্রশাসনিক হয়রানীর কারণে তাঁকে একদিনে তিন বারও বাসা পরিবর্তন করতে হয়েছে। তখনকার সময়ে সাংগঠনিক কাজে আমি তাঁর সাথে মিরপুরের এক বাসায় সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর তিনি তাঁর স্বভাবসূলভ ভঙ্গিতে অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ ভাষায় কুশলাদি বিনিময় করেন। অত:পর বলেন, দীর্ঘদিনের ডায়বেটিক রোগী হওয়ায় প্রতিদিন হাঁটতে হয় বলে এখন ঘরের ভিতরে হাঁটার পর ফ্রেশ হয়ে আসলাম। তখন আমি জানতে চাইলাম কতদিন থেকে এ রোগে ভুগছেন? জবাবে তিনি হেসে বললেন বাংলাদেশের বয়স যতদিন আমার ডায়বেটিকের বয়সও ততদিন। এরপর দীর্ঘ এক ঘটনা বর্ণনা করেন। ১৯৭১ সাল পুরো বছরটি রাজনৈতিক হয়রানীর কারণে তিনি যুবক বয়সে একটি বাড়ীর রান্না ঘরে অন্তরীণ ছিলেন। সংগঠনের নির্দেশে দীর্ঘ প্রায় এক বছর এই ঘুটঘুটে অন্ধকার গৃহেই বন্দী জীবনের মত কাটিয়েছেন। এমনকি রাত্রি বেলাও ঘরের বাহিরে যাওয়ার পরিবেশ ছিলনা। সেই সময় তিনি ডায়বেটিক রোগে আক্রান্ত হন। প্রসঙ্গক্রমে তিনি আরো একটি ঘটনা তুলে ধরেন। ১৯৭২ সালে নবগঠিত বাংলাদেশের তৎকালীন সরকার জামায়াতসহ ইসলামী দলগুলোকে নিষিদ্ধ করে দিলে জামায়াতের প্রকাশ্য কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। তখন কেন্দ্রীয় জামায়াত অভ্যন্তরীণভাবে দলীয় লোকদের সাথে যোগাযোগ ও খবরা-খবর নেয়ার জন্য বিভাগভিত্তিক দায়িত্ব বন্টন করে। জনাব মকবুল আহমদকে তৎকালীন চট্টগ্রাম বিভাগের আমীরের দায়িত্ব দেয়া হয়। একদিন সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি সিলেটের উদ্দেশ্যে রওয়ান দেন। বাস স্টেশনে গিয়ে বাসে সিট না পেয়ে লোকাল বাসের ছাদে উঠে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সাংগঠনিক সফর করেন। এ পর্যায়ের একজন দায়িত্বশীল বাসের ছাদে উঠে যাতায়াত ও কঠিন প্রতিকূল পরিবেশে জেলায় জেলায় সফর করা ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের জন্য একটি বিরল দৃষ্টান্ত। সময়ের প্রেক্ষাপটে সংগঠনের প্রয়োজনে অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগ স্বীকারের জন্য সদা প্রস্তুত থাকার শিক্ষা তাঁর জীবন ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। সেই সময়ের মত বর্তমান সরকারের জুলুম নির্যাতনের শ^াসরুদ্ধকর পরিবেশেও তিনি একই উদাহরণ রেখে গেছেন।
জামায়াতে ইসলামীর এ রাহবার বর্তমান কর্তৃত্ববাদী সরকারের শাসন আমলে সংগঠন ও এদেশের জনগণের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন। সংগঠনের কঠিন সময়েও অসুস্থ্য শরীরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বৈঠকাদিতে নিয়মিত উপস্থিত হয়ে সহকর্মীদেরকে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তাছাড়া এ সরকারের আমলে দীর্ঘ এক যুগ ধরে সংগঠনের অনেক নেতা-কর্মী নিজ বাসায় ঘুমাতে পারছে না। অসংখ্য মিথ্যা মামলা কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। গুম, খুন, নির্যাতনের বোবা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে অনেক পরিবার। তাদের আশ্রয়ের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন এ আপোসহীন নেতা। তাঁর নিজের উপরও মিথ্যা মামলার হুলিয়া ছিল। এ জন্য তিনি বৃদ্ধ বয়সে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অমানবিক জীবন-যাপন করেছেন, জেল খেটেছেন, পুলিশের রিমান্ডে গিয়েছেন। কিন্তু আপোস করেননি। এ যোগ্য সংগঠক এভাবেই সারাদেশের সংগঠনের অগ্রগতির জন্য দুরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার সাথে ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি সর্বাবস্থায় কর্মীদের সাথে সুন্দর ও কোমল ব্যবহার করতেন। কোন সময় কারো মনে কষ্ট দেয়া তাঁর স্বভাব বিরোধী ছিল। সদা হাস্যোজ্জল চেহারা, বাচন ভঙ্গি ও নম্ন-ভদ্র, অকৃত্রিম আন্তরিকতাপূর্ণ আরচণে তিনি ছিলেন অতুলণীয়। সাংগঠনিক নিয়ম-শৃংখলা অনুসরণে কঠোর হলেও রাগ, বিরাগ ও কর্তৃত্ববাদীতা তাকে কখনো স্পর্শ করতে দেখিনি। স্নেহ, ভালবাসা, অকৃত্রিম মমতা ও উদারতার তিনি অনন্য দৃষ্টান্ত।
তিনি জামায়াতের কঠিন সময়ে মুল কান্ডারীর দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন আমীরে জামায়াত ও সেক্রেটারী জেনারেলসহ ৫ জন শীর্ষ নেতার মিথ্যা মামলায় ফাঁসি হয়েছে। অনেক কেন্দ্রীয় নেতা কারাগারে বন্দী অবস্থায় জীবন দিয়েছে। এসব পরিবারের উপর চালানো হয়েছে সরকারের নির্যাতন। সেই কঠিন ও প্রতিকূল পরিবেশে চরম ধৈর্য্যরে পরিচয় দিয়েছেন। অস্থিরতা ও বিষন্নতার উর্ধে থেকে ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি মোকাবিলা করতেন। সব সময় সহকর্মীদের সাথে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে পরামর্শ করে কাজ করতেন। এ সকল গুণাবলী একজন সাধারণ শিক্ষককে অসাধারণ মানুষ বানিয়েছে এবং জামায়াতে ইসলামীর ন্যায় একটি সংগঠনের আমীরের মর্যাদায় উপনীত করেছে।
এ প্রিয় নেতা ঢাকা ও নিজ এলাকায় অনেক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করে জনগণের সেবা করেছেন। তাছাড়া তিনি সহকর্মীদের ব্যক্তিগত খোঁজ-খবর রাখতেন এবং কারো সমস্যা থাকলে তা বিভিন্ন উপায়ে সমাধানের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। কেন্দ্র থেকে জেলা/উপজেলা এমনকি সাধারণ কর্মীদেরও খোঁজ-খবর নিতেন। কুতুবদিয়া উপজেলা নিবাসী একজন রেলওয়ে স্টাফ ও জামায়াতের রুকন মফিজুর রহমান ভাই দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হলে বহুবার তার শারীরিক অবস্থার খোঁজ-খবর নিয়েছেন এবং চিকিৎসার খরচ যোগাড় করে দিয়েছিলেন। আমার যতবার মরহুম মকবুল আহমদের সাথে দেখা হয়েছে মফিজ ভাইয়ের পরিবারের ব্যাপারে তাকিদ দিতেন। পরবর্তীতে মফিজ ভাইয়ের মৃত্যুবরণ করলে তার পরিবারকে কক্সবাজার শহরে বসবাসের ব্যবস্থা করা এবং সন্তানদের পড়া-লেখা ও সংসার খরচের জন্য নিয়মিত টাকা পাঠাতেন। দুনিয়ার দৃষ্টিতে নিজের আত্মীয় বা এলাকার লোক না হয়েও দ্বীনের কারণে তিনি যত পেরেশান ছিলেন আমি একই এলাকার অধিবাসী বা আত্মীয় হয়েও তা পারিনি বলে অত্যন্ত লজ্জিত হতাম।
২০১৭ সালের ০৯ অক্টোবর একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক বৈঠক চলাকালে তিনি মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার হন। ঐ সময় তাঁকে কাশিমপুর-২ নম্বর কারাগারে ‘বকুল’ এর একটি কক্ষে রাখা হয়। দীর্ঘ ২৭৩ দিন কারাভোগের পর ২০১৮ সালের জুলাই মাসে তিনি জামিনে মুক্তি লাভ করেন। ২০১৮ সালে আমিও মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার হয়ে একই জেলখানার একই কক্ষে ১০ মাসের অধিক সময় বন্দী ছিলাম। কারাগারে থাকাকালে নামাজের ঈমাম, বাবুর্চি, সেবক ও বিভিন্ন শ্রেণীর বন্দীদের কাছে মকবুল সাহেবের কারাজীবনের আচরণ ও মানুষের সেবা সম্পর্কে যা শুনেছি তা সত্যিই আমাদেরকে অবিভূত করেছে। তিনি এসব কারাবন্দীদের ব্যক্তিগতভাবে সাহায্য সহযোগিতা করতেন এবং দ্বীনের দাওয়াত দিতেন। তাঁর চেষ্টায় অনেকে কুরআন পড়া শিখেছেন, নামাজ পড়া শিখেছেন। একজন বন্দী মানুষ হওয়া সত্ত্বেও অপর বন্দীদের মানবিক সার্থে পাশে দাঁড়াতেন। শুধু তাই নয়, কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার পরও তিনি তাদের খোঁজ-খবর রাখতেন। তাদেরকে মুক্ত করার জন্য আইনী সহযোগিতা এবং তাদের সন্তানদের বিয়ে-শাদীর জন্য তিনি সাহায্য করেছেন। মরহুম মকবুল সাহেবের এসব উপকারের কথা বর্ণনা দিয়ে অনেক বন্দী আমার সামনে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছেন। সম্পূর্ণ অচেনা একজন মানুষ এত দরদি হতে পারে তা তাদের নিকট অবিশ^াস্য। আসলে জামায়াতে ইসলামী এ ধরণের চরিত্রের মানুষই তৈরী করে।
এরূপ আরো অনেক পরিবার ও ব্যক্তির বিপদের সময় পাশে দাঁড়িয়েছে যার বর্ণনা এ সংক্ষিপ্ত পরিসরে দেয়া সম্ভব নয়। তিনি এত মানুষের সেবা করেছেন যে, পরোপকারী ও সমাজসেবক হিসাবে মকবুল সাহেব সম্পর্কে বিস্তারিত লেখা হলে পৃথক একটি পুস্তক রচনা হয়ে যাবে।
মরহুম মকবুল আহমদ ছিলেন দ্বীনের একনিষ্ট একজন দা’ঈ। যেখানে যেতেন মানুষের সাথে সাক্ষাৎ হলে কুশলাদি বিনিময়ের পর তাদেরকে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের দাওয়াত দিতেন। কারো সাথে পরিচয় হলে আত্মীয় স্বজন ও বন্ধু মহলের নাম ঠিকানা ফোন নম্বর ডায়েরীতে লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। সরাসরি সাক্ষাত ও ফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে ইসলামী সাহিত্য বিতরণ করা তার নিয়মিত কাজের অংশ ছিল। দাওয়াতী কাজে এতো বেশী সচেতন ছিলেন জেলাখানা ও পুলিশ রিমান্ডেও তিনি তা ভুলেননি। রিমান্ড শেষে যখন তাকে আদালতে আনা হলো তার আইনজীবি প্রাইভেট আলাপে তার কাছে জানতে চেয়েছিলেন রিমান্ডে আপনাকে কি জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল? জবাবে তিনি হেসে বললেন, তারাতো আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে, আমিও তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। আমি এসব পুলিশ কর্মকর্তাদের বলেছি আপনারওতো এদেশের সন্তান এবং মুসলমান। আপনারা কি কুরআন পড়েন? নিয়মিত নামাজ পড়েন? আপনাদের পরিবারে স্ত্রী-কন্যা পর্দা করে? সন্তানরা কি কুরআন পড়তে জানে? তার কথা শুনে পুুলিশ কর্মকর্তারা অবাক হয়ে বলেছে স্যার আমাদেরকে তো আর কোন দিন কেউ এভাবে বলেনি। নামাজ, রোজা আদায়ের চেষ্টা করব। রিমান্ডে যেখানে মানুষ ভয়ে আতংকে থাকে সেখানে তিনি ধৈর্য্য ও সাহসীকতার সাথে দ্বীনের দাওয়াত দিয়ে গেছেন যা একটি বিস্ময়কর বিষয়। ২০১২ সালে আমি সংসদ সদস্য হিসাবে সরকারী সফরে চীনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এ সময় আমীরে জামায়াতের অনুমতি ও দোয়া নেয়ার জন্য তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করি। তিনি আমাকে দোয়া করে দিয়ে এক বান্ডিল ইসলামী সাহিত্য হাতে তুলে দিয়ে বললেন, চীনে অনেক বাংলাদেশী নাগরিক আছে এই বইগুলো তাদের মাঝে বিতরণ করবে। সময় হাতে থাকলে প্রবাসীদের একটি দাওয়াতী সভা করে সংগঠন কায়েম করে আসবে। তাঁর নির্দেশনা মোতাবেক চীন সফরে বিশ্রাম ও অবকাশের সময়গুলো দাওয়াতী কাজে ব্যবহার করি। তাতে এতবেশী বরকত হয়েছে যে ঐ সময়ে যারা দাওয়াত কবুল করেছিলেন তারা আজ চীনে কর্মরত বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলাদেশী প্রবাসীদের মাঝে দ্বীনের দাওয়াত ছড়িয়ে দিচ্ছেন। দাওয়াতী কাজে তিনি কুরআন, হাদিস ও বিভিন্ন লেখকের লিখিত ইসলামী সাহিত্য মানুষের মাঝে বিতরণ করতেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি নিজেরও কয়েকটি বই লিখেছেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থ হলো “জাপান সফর- দেখার অনেক, শিখার অনেক” এবং “ইসলামী আন্দোলনের পথে আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার উপযুক্ত হওয়াই আমাদের কাজ”।
মরহুম মকবুল আহমদ জামায়াতে ইসলামীর ন্যায় একটি বড় রাজনৈতিক দলের প্রধান। একটি বড় রাজনৈতিক জোটের শীর্ষ নেতা ছিলেন। তিনি সাংগঠনিক কাজে যেমন দেশে-বিদেশে চসে বেড়িয়েছেন, তেমনি ২০ দলীয় জোটের স্বৈরাচার বিরোধী ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের সভা-সমাবেশ বাস্তবায়নে অগ্রবর্তী সৈনিকের ভূমিকা পালন করেছেন। বয়সে ভারাক্রান্ত এ বর্ষীয়ান নেতা মিথ্যা মামলার হুলিয়া ও শারীরিক অসুস্থতা উপেক্ষা করে সারাদেশে ২০ দলীয় জোটের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে অংশগ্রহণ করে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন। এতদ্সত্ত্বেও তিনি রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচিত ছিলেন না। কারণ তিনি প্রচার বিমুখ ছিলেন। প্রচারনার কাজে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত না হয়ে নিজেকে সব সময় লুকিয়ে রাখতেন। একজন নির্মোহ, নিরহংকার ও স্বজন মানুষ হিসাবে সর্বমহলে সমাদৃত ছিলেন। সংগঠনের বাহিরেও তার ছিল সুবিশাল গ্রহণযোগ্যতা। বিএনপি, আওয়ামীলীগসহ সকল দলের নেতা, বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের কাছে একজন সৎ, পরহেজগার, নিষ্কুলষ চরিত্রের মানুষ হিসাবে পরিচিত ছিলেন। তার ইন্তেকালের খবর শুনে লকডাউনের মাঝে মধ্যরাতে জানাযায় অসংখ্য মানুষের উপস্থিতি মরহুমের জনপ্রিয়তা প্রমাণ হয়েছে। তার সম্পর্কে আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও তাঁর নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দি জয়নাল হাজারী সোস্যাল মিডিয়ায় বলেন, মরহুম মকবুল আহমদ সাহেব একজন ভদ্রলোক ছিলেন। মনে হয় জীবনে কারো সাথে কোন দুর্ব্যবহার করেননি। পরহেজগার মানুষ ছিলেন, সৎ মানুষ ছিলেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। তিনি আরো বলেন, যারা যে ভাবে নেন না কেন, আমি এই মানুষটাকে সৎ হিসাবেই বিবেচনা করি। এমনকি আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি কোন ক্ষতিকর ভূমিকায় ছিলেন না। তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ ছিল না।
জয়নাল হাজারির কথার সত্যতা মিলে ২০১৫ সালে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও মরহুম মকবুল আহমদ সাহেবের একই ইউনিয়নের বাসিন্ধা জনাব আব্দুল আউয়াল মিন্টুর প্রদত্ত বক্তব্যে। ঐ বছর মরহুম মকবুল আহমদ সাহেবের বিরুদ্ধে দাগনভূঞা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ‘জৈনক বাঙ্গালী’ ৭১ সালের তথাকথিত মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগ উত্থাপন করে ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করার জন্য ঢাকায় আসেন। তিনি মিন্টু সাহেবের বড় ভাইয়ের ছত্রছায়ায় পরিচালিত হতেন বলে প্রকাশ আছে। মরহুম মকবুল সাহেব এই সংবাদ পেয়ে বিষয়টি নিয়ে আব্দুল আউয়াল মিন্টু সাহেবের সাথে আলাপ করার জন্য আমাকে বলেন। আমি মিন্টু সাহেবের কাছে এ প্রসঙ্গ তুললে তিনি তেলে-বেগুনে জ¦লে উঠেন। বাঙ্গালী সম্পর্কে অনেক কটু মন্তব্য করে বলেন, আমার স্যার মকবুল আহমদের গায়ে ১৯৭১ সালের কোনো কালিমা নেই। তিনি একজন আল্লাহ ওয়ালা ও সৎ, শান্তশিষ্ট, পরোপকারী, কোমল হৃদয়ের মানুষ। আমাদের এলাকায় তার বিরুদ্ধে কোন অমুসলিমেরও অভিযোগ নেই। তার বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ আনলে তা মোকাবিলার জন্য আমি নিজেকে উৎসর্গ করলাম। স্যারের কাছে আমার সালাম ও এ কথা পৌঁছে দিবেন। এক আল্লাহ ছাড়া কেউ স্যারের ক্ষতি করতে পারবে না। ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউটরের পক্ষ থেকে মরহুম মকবুল আহমদ সাহেবের বিরুদ্ধে উত্থাপিত কথিত অভিযোগ তদন্তের জন্য একাধিকবার টীম পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু কাউকে বাদী হওয়ার জন্য রাজি করাতে পারে নাই। যে সকল হিন্দুদের বাদী হওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিল তারা মকবুল সাহেবের মতো নিষ্কুলষ মানুষের বিরুদ্ধে বাদী হওয়া থেকে বিরত থাকার জন্য এলাকা ছেড়ে ঢাকায় আশ্রয় নিয়েছিল। এরপর ট্রাইব্যুনাল এ ব্যাপারে আর কোন উদ্যোগ নিতে সাহস করেনি।
দ্বীনের এ মর্দে মুজাহিদ ইন্তেকালের কিছু সময় আগেও মানবতার কল্যাণে কতো পেরেশান ছিলেন কর্তব্যরত চিকিৎসক বলেন, এখানে জীবন মৃত্যর মাঝে বসেও অন্যদের খোঁজ-খবর নিয়েছেন। কিভাবে তার পরিচিত কিছু লোকের আয়ের ব্যবস্থা করে তাদের পরিবারের দুর্দশা দুর করা যায় সেই আকাংখা। নিজের জন্য বা পরিবারের জন্য কোন আক্ষেপ নাই। দিনে বেশ কয়েকবার তাকে ডাক্তার হিসেবে খুব কাছ থেকে দেখেছি প্রতিবারেই মাথা নাড়িয়ে বলেছেন কোন কষ্ট নেই। যেন প্রিয় রবের সাক্ষাতের ঘ্রাণ তার সব কষ্ট দূর করে দিয়েছে। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছেন জীবনের সেই কাংখিত মুহুর্তের জন্য।
দুপুর ১১টায় দেখেছি তখন তার জাগতিক অবস্থা ভয়াবহ খারাপ সবাই বুঝতে পারছিলাম। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্ট করছি, বাকীটা মহান আল্লাহর বিশেষ রহমতের অপেক্ষা। তখনও তিনি মাথা নাড়িয়ে বলেছিলেন আর কোন কষ্ট নাই। এর কিছুক্ষণ পরেই আল্লাহ তাকে কবুল করলেন।
মরহুম মকবুল আহমদ এ পৃথিবী ছেড়ে চিরদিনের মতো আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গিয়েছেন আর কখনো ফিরে আসবেন না। কিন্তু আমাদের জন্য রেখে গিয়েছেন অনেক শিক্ষা ও উপদেশ। জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। দেশের মানুষ ও দেশ-বিদেশের ইসলামী আন্দোলনের কর্মীগণ তাকে আজীবন স্মরণ রাখবে। দেশ, জাতী ও ইসলামী আন্দোলনের জন্য তিনি যে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন তার জন্য যুগ যুগ ধরে তিনি অমর হয়ে থাকবেন। তিনি সারাজীবন আল্লাহর দ্বীনের পথে নিবেদিত ছিলেন এবং এজন্য জীবন উৎসর্গ করার শপথ করেছিলেন। সবসময় শহীদি মৃত্যু কামনা করেছেন। সেই মৃত্যু আল্লাহ তায়ালা মহামারীর আক্রমনে হাসপাতালের বিছানায় কবুল করেছেন। আমরা রাব্বুল আলামীনের কাছে এই মুনাজাত করি যে তিনি যেন তার জীবনের সমস্ত ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে নেকিতে ভরপুর করে দেন। তার নেক আমল কবুল করে শহীদের মর্যাদা দিয়ে তাঁকে সম্মানিত করুন। তার রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজ যেন লক্ষ লক্ষ ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে সেই তৌফিক দান করুন, আমীন॥









