॥ এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ ॥

পনেরো

আল্লামা সাঈদীর (রাহি.) কারাজীবন ছিল অত্যন্ত কষ্টদায়ক ও বেদনাবিধুর। ২০১০ সালে তথাকথিত ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার হয়ে তিনি বন্দি হন। তখন ওনার বয়স সত্তরের ঊর্ধ্বে। হার্টে ৫টি রিং পরানো ছিল। ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপসহ নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি বন্দিজীবনে অনেক জুলুম-নির্যাতন ধৈর্য ও দৃঢ়তার সাথে মোকাবিলা করেছেন। বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন ইসলামবিরোধী জালিম সরকারের দায়েরকৃত বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় ৯৩ দিন রিমান্ডে থাকাকালে অসহনীয় কষ্ট সহ্য করেছেন। রিমান্ডে দিনের পর দিন নির্জন অন্ধকার প্রকোষ্ঠে একাকী সময় কাটিয়েছেন। এ সময় সরকার বিভিন্ন অপকৌশলের মাধ্যমে ওনাকে মানসিকভাবে অত্যাচার করে। এত কিছুর পরও আল্লামা সাঈদী ছিলেন সত্য ও ন্যায়ের পথে আপসহীন এবং সংগঠনের প্রতি ছিল তাঁর নিরঙ্কুশ আনুগত্য। ঐ সময় জালিম শাসকগোষ্ঠীর সাথে আপস করলে বাকি জীবন সুখে-শান্তিতে কাটাতে পারতেন। কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের এ অকুতোভয় সৈনিক দুনিয়ার সকল লোভ-লালসা ও সুযোগ-সুবিধার পরিবর্তে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি জেলখানায় আমার সাথে বিভিন্ন সময়ে আলাপচারিতার মাঝে কারাজীবনের সেই ঘটনাগুলো বর্ণনা করেছিলেন। এখানে আমি এর উল্লেখযোগ্য কিছু দিক তুলে ধরার চেষ্টা করব। আল্লামা সাঈদী ২০১০ সালে গ্রেফতার হওয়ার প্রথম দিকের ঘটনাবলি ছিল অত্যন্ত নির্মম, জঘন্য ও বর্বরোচিত। ওনার ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে প্রথমবার সিআইডিতে রিমান্ডে এনে টানা চব্বিশ ঘণ্টা অন্ধকার প্রকোষ্ঠে রাখা হয়েছিল। খাওয়া-দাওয়া, নামায ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে হয় গভীর অন্ধকারে। ওনাকে মানসিকভাবে দুর্বল করার জন্য সেখানে নানা ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। এত জুলুম ও নির্যাতন চালানোর পরও ফ্যাসিস্ট শক্তি যখন আল্লামা সাঈদীকে আদর্শচ্যুত করতে পারেনি, তখন শেষ চেষ্টা হিসেবে তারা এক নোংরা ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিয়েছিল। তা হলো রিমান্ড চলাকালে ওনার কয়েকজন নিকটাত্মীয়কে ডেকে এনে একটি লোভনীয় প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবটি হলো- ‘তিনি জামায়াতে ইসলামী ত্যাগ করে দেশের আলেম-ওলামা এবং জামায়াতে ইসলামীতে যারা ওনার ভক্ত আছেন, তাদের নিয়ে নতুন একটি পৃথক ইসলামী দল গঠন করবেন। এ প্রস্তাবে রাজি হলে সরকার ওনার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল মামলা প্রত্যাহার করে বন্দিজীবন থেকে মুক্তি দেবে। সেইসাথে দল পরিচালনার জন্য সরকার যাবতীয় সহযোগিতা প্রদান করবে।’ আল্লামা সাঈদী জেলখানায় থাকাকালীন আমাকে যখন এ কথাগুলো বলছিলেন, তখন আমি কথাগুলো অবাক-বিহ্বল হয়ে শুনছিলাম। তিনি এ প্রস্তাবের জবাবে স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, “আমাকে এ ধরনের নোংরা প্রস্তাব দেয়ার সাহস তাদের কীভাবে হলো? আপনারা তাদের জানিয়ে দেবেন- আমার জীবনে যত সম্মান, মর্যাদা, খ্যাতি, সুনাম ও মানুষের ভালোবাসা অর্জিত হয়েছে, এর সবকিছু আল্লাহ তায়ালার কুরআন এবং জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি দীনি সংগঠনে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণেই হয়েছে। আর এ কারণেই আমি সকলের কাছ থেকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পেয়ে থাকি। তাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি সহীহ ও পূর্ণাঙ্গ দীনি সংগঠন ত্যাগ করা আমার জন্য কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। আর এ কথাও জেনে রাখুন, যেদিন আমি জামায়াতে ইসলামী ত্যাগ করব সেদিন থেকে জামায়াত অফিসের একজন দারোয়ানও আমার কথা শুনবে না। তাছাড়া দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনে অত্যাচারী শাসকের সহযোগী হয়ে আরামের জিন্দেগীর চেয়ে ইসলামী আন্দোলনের পথে আমার পূর্বসূরিদের পথ অনুসরণ করে কারাগারে জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে শাহাদাতের মৃত্যুকে আমি শ্রেয় মনে করি।”

অতঃপর আল্লামা সাঈদী মনের আবেগ দিয়ে ইমামে আযম হযরত আবু হানিফার কারাগারে কষ্টে মোড়ানো জীবনের একটি খণ্ডচিত্র আমাকে বর্ণনা করে শোনান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খলিফা আবু জাফর মনসুরের সময় সবচেয়ে প্রভাবশালী ইসলামী ব্যক্তিত্ব ছিলেন ইমামে আযম হযরত আবু হানিফা (রাহি.)। তিনি একজন নিষ্ঠাবান জ্ঞানতাপস। সারা জীবন জ্ঞান চর্চা ও ফিকহী মাসআলা-মাসায়েল শিক্ষা দিয়েছিলেন। ৭৬৮ খ্রিষ্টাব্দে খলিফা মানসুর তার ক্ষমতার স্বার্থে ইমাম আবু হানিফাকে প্রধান বিচারপতির পদ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানান। তিনি উক্ত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে খলিফাকে সম্বোধন করে বলেন, “আল্লাহর শপথ! কোনো ব্যাপারে আমার ফয়সালা যদি আপনার বিরুদ্ধে যায় এবং আপনি আমাকে হুকুম দেন যে হয়তো সিদ্ধান্ত পাল্টাও, না হলে তোমাকে ফোরাত নদীতে ডুবিয়ে মারা হবে। তখন আমি ডুবে মরতে প্রস্তুত থাকব, তবু সিদ্ধান্ত পাল্টাতে পারব না। তাছাড়া আপনার দরবারে এমন অনেক লোক রয়েছে, যাদের মনোতুষ্টি করার মতো কাজীর প্রয়োজন।’’ ইমাম আবু হানিফা খলিফার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর তাকে ত্রিশটি বেত্রাঘাত করা হয়। যার ফলে তাঁর সারা শরীর রক্তাক্ত হয়ে পড়ে। এ সময়ে ইমাম আবু হানিফার বয়স ছিল সত্তর বছর। শেষ পর্যন্ত নিজের মতে অটল থাকায় তাঁকে কারারুদ্ধ করে পানাহারে কষ্ট দেয়া হয় এবং নানাভাবে নির্যাতন করা হয়। ঐ সময় তিনি আট বছর পর্যন্ত কারারুদ্ধ ছিলেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলÑ ইমাম সাহেব দীর্ঘদিন ধরে জেলের মধ্যে আছেন, কষ্ট হয়? তিনি জবাবে বলেছিলেন- না, কষ্ট হয় না। তবে মাঝে মাঝে মনে একটু কষ্ট হয়। দুই-চার মাস পরপর আমার বুড়ি মা’কে জেলখানায় হাজির করিয়ে তার সামনে আমাকে পেটানো হয়। ছেলেকে পেটানো দৃশ্য দেখে বুড়ি মা যেন আমাকে বলে, এদের সাথে একমত হয়ে যা। সেজন্য আমাকে মায়ের সামনে পেটানো হয়। কিন্তু তাদের পেটানো দেখে আমার মায়ের চোখ থেকে পানি পড়তে থাকে। তখন আমার মনে কষ্ট লাগে। তবে আলহামদুলিল্লাহ, আমার মা এমন এক মহীয়সী নারী, যিনি তাদের পেটানো দেখে হজম করেন। আর আমাকে বলেন, খবরদার একচুলও সিদ্ধান্ত থেকে নড়বা না।

আল্লামা সাঈদীর উক্ত বর্ণনা শুনে বুঝতে পারলাম, যুগে যুগে যারা ঈমানের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন, সেই সকল দীনের মুজাহিদ ও মুজতাহিদগণ এক্ষেত্রে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জন্য উজ্জ্বল নজির স্থাপন করে গেছেন। বর্তমান শতাব্দীতেও যা অব্যাহত রয়েছে।

আল্লামা সাঈদীকে জামায়াতে ইসলামী থেকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা নতুন নয়। এ প্রসঙ্গে তিনি ১৯৮৭ সালের আরেকটি ষড়যন্ত্রমূলক ঘটনা তুলে ধরেন। মূল ঘটনা বলার আগে তিনি প্রথমে পেছনের ইতিহাস দিয়ে কথা শুরু করেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেবের সাথে ১৯৭৭ সালে লন্ডনে আমার দেখা হয়। সেখানে দেশের পরিস্থিতি ও ইসলামপন্থীদের ঐক্য সম্পর্কে আলাপ-আলোচনার সময় তিনি আমাকে বলেন, বাংলাদেশে আল্লাহর দীনকে বিজয় করতে হলে অসংগঠিত ইসলামী শক্তিসমূহকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। এ লক্ষ্যে ইসলামী দলগুলোর ঐক্যের ব্যাপারে একটি ফর্মুলা নিয়ে আমার সাথে পরামর্শ করেন। (ওনার ফর্মুলাটি পরে ‘ইসলামী ঐক্য : ইসলামী আন্দোলন’ নামে পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়) তাঁর এ ফর্মুলা আমার পছন্দ হওয়ায় তিনি আমাকে পরামর্শ দেন, আপনার মাহফিলসমূহে বহু আলেম-ওলামা উপস্থিত থাকেন। সম্ভব হলে আপনি মাহফিলের শেষে আলেমগণের সাথে বৈঠক করে এ ফর্মুলা সম্পর্কে আলোচনা করতে পারেন। এরপর দেশে ফিরে খ্যাতনামা ওলামা-মাশায়েখ ও ইসলামী ব্যক্তিবর্গের সাথে আলোচনা শুরু করি এবং সারা দেশে অনুষ্ঠিত তাফসিরুল কুরআন মাহফিলে এ বিষয়ে ইসলামপ্রিয় জনতাকে উদ্বুদ্ধ করতে থাকি। এতে কওমি ও আলিয়া নিসাবের ওলামা-মাশায়েখসহ সকল দীনি মহলের সাড়া পাওয়া গেলে আমি বেশ উৎসাহবোধ করি। এ প্রেক্ষিতে অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেবের পরামর্শ ও নির্দেশনার আলোকে ১৯৮১ সালের ডিসেম্বর মাসে শীর্ষস্থানীয় ওলামা-মাশায়েখের উদ্যোগে ‘ইত্তেহাদুল উম্মাহ বাংলাদেশ’ নামে ব্যাপকভিত্তিক একটি ইসলামী ঐক্যমঞ্চ গঠিত হয়। সকল মত ও পন্থার আলেম সমাজের একনিষ্ঠ প্রচেষ্টা, ইসলাম দরদি ব্যক্তিবর্গের সহযোগিতা এবং ইসলামপ্রিয় জনতার স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন থাকায় সারা দেশে ইসলামী ঐক্যের পক্ষে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দেয়। তখন আমি ইত্তেহাদুল উম্মাহর অগ্রগতি সম্পর্কে অত্যন্ত উৎসাহ প্রকাশ করে অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেবকে একাধিকবার বলেছি, “আপনি এমন এক চমৎকার ফর্মুলা দিয়েছেন, যার ফলে এ সংগঠনের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির নেতৃত্ব নয়; বরং সামষ্টিক নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে। আর অরাজনৈতিক সংগঠন হওয়ায় এতে কোনো দলাদলির আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে না।”

সেদিন আনন্দঘন পরিবেশে একপর্যায়ে কথাগুলো বলার পর তিনি কিছুক্ষণের জন্য নীরব হয়ে যান। অতঃপর ভারাক্রান্ত হৃদয়ে কাতর কণ্ঠে তিনি বলেন, কিছু লোকের ভুলের কারণে দুর্ভাগ্যক্রমে ১৯৮৬ সালের শেষদিকে একটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে গিয়েছিল। যার ফলে ইত্তেহাদুল উম্মাহ হঠাৎ করে স্তব্ধ হয়ে গেল। দীর্ঘ ৬টি বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে গড়ে ওঠা যে ইসলামী ঐক্যমঞ্চের মাধ্যমে ইসলামের বিজয়ের স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেটি এভাবে স্তব্ধ হয়ে যাবে, তা কখনো ভাবিনি। তখনকার ঘটনাটি মনে পড়লে আমি যতটা ব্যথিত হই, তা অন্য কোনো ঘটনায় এত কষ্ট পাই না। অতঃপর তিনি বলেন, ঐ বছরের ডিসেম্বর মাসে মজলিসে সাদারাতের এক বৈঠকে বাংলাদেশে ইসলামী শাসনতন্ত্র কায়েম করার লক্ষ্যে আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। উক্ত দাবিতে আন্দোলন শুরু হলে সারা দেশের জনগণের মাঝে বিপুল সাড়া জাগে। মানুষের মধ্যে ব্যাপক ইসলামী জযবা দেখে ইত্তেহাদুল উম্মাহর নেতৃবৃন্দ আন্দোলন আরো জোরদার করার পরিকল্পনা করেন এবং একটি বিদেশি দূতাবাসের কিছু লোক এর সাথে সম্পৃক্ত হয়। তারা এ আন্দোলনকে সহযোগিতার কথা বলে পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য তাদের দূতাবাসে বৈঠকের আয়োজন করে। সেই বৈঠকে ইত্তেহাদুল উম্মাহর কোনো কোনো নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি যোগদান করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের ঘোষণা দেয়ার তারিখ নির্ধারণ করে। একই সাথে সেদিন কে কে বক্তব্য রাখবেন, সেই সিদ্ধান্তও গ্রহণ করে। দেশের বিভিন্ন স্থানে তাফসিরুল কুরআন মাহফিলগুলোয় সকল শ্রেণির মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি ও ইসলামী জনতার জযবাকে বিবেচনা করে ইসলামী শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবির আন্দোলনে নেতৃত্বের জন্য তারা আমাকে বাছাই করেছিলেন। আমার ওপরে নেতৃত্বের দায়িত্ব অর্পণের জন্য যারা পরিকল্পনা করেছিলেন, তারা জামায়াতে ইসলামীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তারা আমাকে নেতৃত্ব গ্রহণে সম্মত করার জন্য একটি সুন্দর যুক্তি আমার সামনে পেশ করে। তাদের যুক্তি ছিলÑ “দেশের জনগণ ইসলাম চায়। আপনার মাহফিলে যেকোনো সময় দলে দলে নারী-পুরুষ পরম আবেগ নিয়ে হাজির হয়। তারা মাহফিলে ‘আল কুরআনের আলো, ঘরে ঘরে জ¦ালো’ স্লোগান শেখে এবং বাড়িতে ফিরে যাওয়ার সময় এ স্লোগানটি দিতে দিতেই যায়। কুরআনের শাসন কায়েমের দাবিতে তাদের আপনি ডাক দিলে তারা জান দিতেও পরোয়া করবে না। ফলে কোটি কোটি তাওহিদী জনতা পাগলপারা হয়ে এ আন্দোলনে শরিক হবে এবং এ আন্দোলনের ফসল জামায়াতে ইসলামীর ঘরেই উঠবে। জনগণের ময়দানে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো জনশক্তি যেহেতু জামায়াতই তৈরি করেছে, তাই এর ফসল অন্য কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না।” সুতরাং জনগণ আন্দোলনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এখন আর বিলম্ব করা চলে না। সেদিন যারা জামায়াতের ঘরে এ আন্দোলনের ফসল তুলে দিতে চেয়েছিলেন, সেই ফসল জামায়াত গ্রহণ করতে প্রস্তুত কিনা, তা জানার কোনো প্রয়োজনীয়তা তারা অনুভব করেননি। বস্তুত এটি ছিল তাদের অদূরদর্শিতার বহিঃপ্রকাশ।

এ পরিকল্পনা জানার পর জামায়াতে ইসলামী ৩১ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা এক জরুরি অধিবেশন আহ্বান করে। মজলিসে শূরার অধিবেশনে তৎকালীন আমীরে জামায়াত অধ্যাপক গোলাম আযম পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, “আমাদের আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট গোটা জনশক্তি মাওলানা সাঈদীকে মহব্বত করেন। তাই মজলিসে শূরাকে এ সম্পর্কে অবহিত করার প্রয়োজন অনুভূত হয়েছে, যাতে জনশক্তিকে ডিল করতে সমস্যা না হয়। এখন মাওলানা সাঈদী সফরে আছেন। তিনি ফিরে এলেই তাঁর সাথে যোগাযোগ করা হবে। সংগঠনের প্রতি তাঁর আনুগত্যের যে প্রমাণ এ পর্যন্ত তিনি দিয়েছেন, তাতে তাঁর প্রতি জামায়াতের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তিনি যখনই জানতে পারবেন যে, জামায়াত ও শিবির ঐ নতুন আন্দোলনে শামিল হবে না, তখনই তিনি বিরত হয়ে যাবেন। যারা তাঁকে এ পথে এতদূর টেনে নিয়ে গেছেন, তাদের ত্যাগ করে ফিরে আসতে তিনি এতটুকুও দ্বিধাবোধ করবেন না বলে আশা করা যায়। তবুও খোদা না করুন, যদি এ আন্দোলন শুরু হয়ে যায় এবং তিনি তাতে শরিক থাকেন, তাহলে আমাদের জনশক্তি যেন নীরবে তাতে শরিক হওয়া থেকে বিরত থাকে। এর চেয়ে বেশি কোনো প্রতিক্রিয়া যেন কেউ না দেখায়। সবাইকে এতটুকু অবহিত করেই শূরার জরুরি অধিবেশন সমাপ্ত করা হয়।”

তবে এখানেই ঘটনাটি শেষ হয়নি। সাবেক আমীরে জামায়াত অধ্যাপক গোলাম আযম (রাহি.)-এর লিখিত ‘বাংলাদেশে ইসলামী ঐক্য প্রচেষ্টার ইতিহাস’ বইয়ের ৩৯-৪০নং পৃষ্ঠায় পরবর্তী ঘটনাবলি বর্ণনা করেছেন, যা নিম্নরূপ-

“১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের যেদিন ‘আগামীকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে ইত্তেহাদুল উম্মাহর প্রেস কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হবে’ বলে পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হলো, সেদিন মাওলানা আবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসুফ মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাথে একান্তে কথা বললেন। মাওলানা ইউসুফ মাদরাসায় মাওলানা সাঈদীর শিক্ষক। তদুপরি তিনি তখন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল। এ কারণেই জামায়াতের পক্ষ থেকে মাওলানা সাঈদীর সাথে আলোচনা করার দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পণ করা হয়েছিল।”

উভয়ের মধ্যে যে আন্তরিক মহব্বতের সম্পর্ক রয়েছে, সে পটভূমিতে মাওলানা ইউসুফ কোনো কৈফিয়ত তলব না করে শুধু এটুকু কথা জানিয়ে দিলেন, “আগামীকাল প্রেস কনফারেন্স করে যে আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে, তাতে আপনি যদি শরিক হন, তাহলে তা আপনার নিজস্ব ফয়সালা। জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে এ আন্দোলনে আপনার সাথে পাবেন না। কারণ জামায়াত এ আন্দোলন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। আপনি আজীবন জামায়াত ও শিবিরের সাথে ইসলামী আন্দোলন করে এসেছেন, এখন জামায়াত ও শিবিরকে বাদ দিয়ে এ আন্দোলনে যাবেন কিনা, চিন্তা করে দেখুন। এ সিদ্ধান্ত জানার পর মাওলানা সাঈদীর এক মিনিটও বিলম্ব হলো না। তিনি চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলে উঠলেন, “জামায়াত ও শিবিরকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না।”

আমরা তাঁর কাছ থেকে এটাই আশা করেছিলাম। সংগঠনের প্রতি তাঁর আনুগত্য নিরঙ্কুশ বলেই আমরা জানতাম। তিনি জামায়াত ও শিবিরকে ছেড়ে গেলে যে এ ময়দানে কিছুই করতে পারতেন না, এমনও নয়। তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে একটা আন্দোলন অবশ্যই তিনি খাড়া করতে পারতেন। কিন্তু এ আন্দোলনের ফসল জামায়াতের ঘরে উঠবে বলে যে ধারণা তাঁকে দেওয়া হয়েছিল, তা যে হবে নাÑ এ কথা বুঝতে তাঁর এক মুহূর্তও বিলম্ব হয়নি।

সারা দেশে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে যে বিশাল জনপ্রিয়তা দিয়েছেন, তাতে তিনি যেকোনো সময় ইচ্ছা করলে নিজস্ব সংগঠন গড়ে তুলতে পারতেন। তিনি জামায়াতের পুরনো রুকন হিসেবে খুব ভালো করেই জানেন যে, জামায়াত যে পদ্ধতিতে সংগঠন পরিচালনা করে এবং যে কঠোর নিয়ম মেনে চলেÑ এমন সংগঠন করা খুবই কঠিন কাজ। তাই তিনি সংগঠনের আনুগত্যে কোনো সময়ই দুর্বলতা দেখাননি। পরের দিন জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন হওয়ার কথা। মাওলানা সাঈদী সেখানে যাবেন না বলে আমরা নিশ্চিত হলাম। সেখানে কী ঘটবে, সে বিষয়ে আমাদের ঔৎসুক্য অবশ্যই ছিল।

সেদিন সকাল ১০টায় হঠাৎ বেগম সাঈদী আমার বাড়িতে এসে হাজির। আমি রীতিমতো অপ্রস্তুত। তিনি পেরেশান হয়ে বলতে লাগলেন, “একদল লোক মাওলানা সাঈদীকে জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন করে অন্য একটি আন্দোলনের নেতৃত্বে তাঁকে অধিষ্ঠিত করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। গত মধ্যরাত পর্যন্ত তারা আমাদের বাড়িতে তাঁর পা ধরে ধরনা দিয়েছে। আপনি তাঁকে ওদের খপ্পর থেকে বাঁচান।”

আমি ধীরকণ্ঠে বললাম, “ভাবি! আপনি পেরেশান হবেন না। তিনি ওদের সাথে যাবেন না বলে গতকালই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমি অত্যন্ত বিস্মিত হলাম যে, বেগম সাঈদী এতটা রাজনীতি-সচেতন কেমন করে হলেন? তিনি তো সংগঠনেও তেমন কোনো দায়িত্বে নেই। অথচ এ সময় মাওলানা সাহেবকে কতক লোক জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চেষ্টা করছে বলে কেমন করে বুঝতে পারলেন? আমি তাঁর বিচক্ষণতায় মুগ্ধ হলাম।”

উপরোক্ত ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, আল্লামা সাঈদীর জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে একটি মহল ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের নামে ইসলামী শক্তির একটি নতুন ধারা সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। এজন্য তারা সুপরিকিল্পতভাবে ওনার সামনে ওপরে বর্ণিত যুক্তিটি পেশ করেছিলেন। যুক্তিটি বেশ আকর্ষণীয় হলেও এর নেপথ্যে যারা কাজ করেছেন, তাদের পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল আল্লামা সাঈদীকে জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন করে পৃথক একটি ইসলামী দল গঠন করা। যাতে জামায়াতে ইসলামী ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই দুই দফা আল্লামা সাঈদীকে জামায়াতে ইসলামী থেকে বিচ্ছিন্নের চেষ্টা করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে তিনি ও তাঁর পরিবারের জামায়াতে ইসলামীর প্রতি আনুগত্য ও ভালোবাসা সকল ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে দিয়েছিল। ইসলামবিরোধী শক্তির সকল চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার কারণে তারা শেষ অস্ত্র হিসেবে তথাকথিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (বাংলাদেশ)-এর মাধ্যমে মিথ্যা মামলায় সাজানো রায়ে ফাঁসি দিয়ে ওনাকে দুনিয়া থেকে চিরতরে বিদায় করার ষড়যন্ত্র পাকাপোক্ত করে। কিন্তু শত ষড়যন্ত্র করেও আল্লামা সাঈদীকে আদর্শ থেকে বিচ্যুত করা সম্ভব হয়নি। ষড়যন্ত্রকারীদের পরিকল্পনাও সফল হয়নি। (চলবে…)