আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (রাহি.) একটি সোনালি ইতিহাস

॥ এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ ॥

৭ম পর্ব

ষোলো

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার লোভ-লালসা, ভয়ভীতি ও নানা রকম কূটকৌশলের মাধ্যমে দীর্ঘদিন প্রচেষ্টা চালিয়ে আল্লামা সাঈদীকে আদর্শচ্যুত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। অবশেষে তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আল্লামা সাঈদীর ঈমানী শক্তি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রতি তার কমিটমেন্ট এত গভীরে প্রোথিত, যা অন্য কোনোভাবে দুর্বল করা সম্ভব নয়। এ কারণে ইসলামবিরোধী এ অপশক্তি তাদের পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক ওনাকে জুডিশিয়াল কিলিংয়ের মাধ্যমে দুনিয়া থেকে বিদায় করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। ২০১১ সালে তার বিরুদ্ধে তথাকথিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (বাংলাদেশ) যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ দায়ের করে। তার বিরুদ্ধে নানা ধরনের গল্প ও কাহিনী সাজিয়ে বিচারের নামে হয়রানি করে। দীর্ঘ ১৩ বছর পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে তাকে কারাগারে দুর্বিষহ জীবনযাপনে বাধ্য করে। বৃদ্ধ বয়সে অসুস্থ শরীরে কারাগারে বন্দি থাকাকালীন সময়ে সকালে আদালতে হাজিরা দিতে যাওয়া এবং সন্ধ্যাবেলা ক্লান্ত শরীরে ফেরা ছিল তার নিত্যদিনের ঘটনা। তথাপি তাকে কখনো বিচলিত দেখা যায়নি। ঈমানী শক্তিতে বলীয়ান দীনের এ মুজাহিদ সকল কষ্ট, দুঃখ-বেদনা মনের গভীরে চেপে রেখে সকলের সাথে হাসিমুখে কথা বলতেন। আল্লাহ তায়ালার প্রতি দৃঢ় ঈমান ও তাওয়াক্কুল তাকে সবসময় উজ্জীবিত রাখতো। কারাগারের বন্দিদের জন্য তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণা। কারা অভ্যন্তরে কর্মরত সকলের জন্য ছিলেন অনুপম আদর্শ ও প্রিয়ব্যক্তিত্ব। ২০১১ সালের শেষ দিকে গ্রেফতার হওয়ার পর প্রায় আড়াই মাস ওনার সাথে তৎকালীন কেন্দ্রীয় কারাগারে অতিবাহিত করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। তখন সেখানে আমীরে জামায়াত ও সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীও বন্দি ছিলেন। ওনাদের সান্নিধ্যে থেকে আমি নিজের জীবনের জন্য অনেক পাথেয় অর্জন করেছি। এটি নিশ্চিত যে, অনেক স্মৃতিবিজড়িত সেই অমূল্য সময়গুলো আমার জীবনে আর কখনো ফিরে আসবে না। তবে তৎকালীন কেন্দ্রীয় কারাগারের ঘটনাবলী স্মৃতির পাতায় যখন ভেসে আসে, তখন আমি অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি এবং সেখান থেকে প্রেরণা লাভ করি, যা আমার ঈমানী চেতনায় নব জাগরণ তৈরি করে।

পুরাতন ঢাকার সুউচ্চ দেয়ালে ঘেরা এ কারাগার ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কারাগার এবং হাজার ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। একসময়ের মোঘল দুর্গটি ১৭৮৮ সালে সংস্কার করে ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী কারাগারে রূপান্তর করে। তৎকালীন পূর্ব বাংলা, পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে অনেক রাজবন্দি এ কারাগারে তাদের জীবনের মূল্যবান সময় কাটিয়েছেন। ২০১৬ সালের জুলাই মাসের ২৯ তারিখ কেরানীগঞ্জে নতুন করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মাণ করা হলে ২২৮ বছরের পুরনো এ কারাগারকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। তখন সেখানে ছয় হাজারের বেশি বন্দি আটক ছিল। ৩৮ একর জায়গার ওপর বিস্তৃত এ কারাগারের ধারণক্ষমতা সাড়ে ছয় হাজার হলেও সরকার বিরোধী আন্দোলনের কারণে ২০১১ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি কারাবন্দি সেখানে অবস্থান করতো। এতে থাকা-খাওয়া, গোসল, শৌচাগার, রাতে ঘুমানো ও চিকিৎসাসহ ন্যূনতম নাগরিক সুবিধার অভাবে চরম কষ্টে জীবনযাপন করতে দেখেছি বন্দি মানুষকে। ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকার এ কেন্দ্রীয় কারাগারের পশ্চিম-দক্ষিণ কর্ণারে ২৬নং সেল অবস্থিত। সেখানে শ্রেণিপ্রাপ্ত বন্দিদের আটক রাখা হতো। চারদিকে বাউন্ডারি ঘেরা পৃথক এলাকায় এ সেলে পৃথক একটি গেট আছে। এ গেট দিয়ে সেখানে আটক বন্দিগণ চলাচল করতো। ভেতরে ভিআইপি বন্দিদের থাকার জন্য পৃথক ৮টি কক্ষ, সামনে লম্বা বারান্দা ও কর্ণারে ১টি পাকের ঘর। বন্দিদের হাঁটা-চলার জন্য ছিল সরু একটি রাস্তা। ঐ সময়ে যারা বন্দি ছিলেন অধিকাংশই ছিলেন বয়োবৃদ্ধ। তাই শারীরিক ফিটনেস ঠিক রাখার জন্য এ রাস্তা দিয়ে সকাল-বিকাল বন্দিরা হাঁটাহাঁটি করতেন। আল্লামা সাঈদীকে নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হতো। এজন্য তিনি প্রতিদিন বিকালবেলা ঐ রাস্তায় হাঁটতেন। আমি যতদিন ছিলাম, ততদিন ওনার হাঁটার সঙ্গী হতাম। হাঁটার সময় দুজনে বিভিন্ন ধরনের আলাপ-আলোচনা করতাম। আলোচনার সময় লক্ষ করতাম, ওনার মাঝে সবসময় দুটি আকাক্সক্ষা প্রবলভাবে কাজ করতো। ওনার বর্ণনা অনুযায়ী এর একটি হলো, “আল্লাহ তায়ালা যদি আমাকে এখান থেকে নাজাত দান করেন, তাহলে আমার প্রথম কাজ হবে বায়তুল্লার তাওয়াফ ও রাসূলের (সা.) রওজা জিয়ারত করা। এ কথা বলতে বলতে আকাশের দিকে তাকালেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, “ঐ দেখেন, একটি পাখি মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। পাখিটির মতো আমি যদি উড়াল দিতে পারতাম, তাহলে আল্লাহর ঘর কা’বায় এবং মদিনায় রাসূলের (সা.) রওজায় চলে যেতাম।” কিন্তু এখন আমি জালিমের খাঁচায় বন্দি। গত দুই বছর চলে গেল আল্লাহর ঘরের তাওয়াফ, নামাজ ও ইতিকাফ এবং নবীজির রওজার পরশ থেকে আমাকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। বিশেষ করে বছর ঘুরে রমজান মাস এলে আমার হৃদয়-মন কেঁদে ওঠে। তিনি জীবনের দীর্ঘসময় রমজানের শেষ দশক হেরেমের অভ্যন্তরে ইতিকাফ করেছিলেন। সে দিন ইতিকাফকালীন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বেশ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কাবাঘর ও মদীনায় রাসূল (সা.)-এর রওজা মোবারকের প্রতি ওনার এত গভীর অনুভূতি দেখে আমি এর কারণ অনুসন্ধান করার পর কুরআন-হাদিসের মাঝে সমাধান খুঁজে পেলাম। কাবাঘরের মর্যাদা প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর স্মরণ কর, যখন আমি কাবাকে মানুষের জন্য মিলনকেন্দ্র ও নিরাপদ স্থান বানালাম এবং বলেছি (আদেশ দিলাম যে), ‘তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থানরূপে গ্রহণ কর’। আর আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম যে, ‘তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ‘ইতিকাফকারী ও রুকুকারী-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র কর’। [সূরা বাকারা : ১২৫]।

দুনিয়ার সবচেয়ে মর্যাদা ও সম্মানের স্থান পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনা। এ দুই স্থানে অবস্থিত পবিত্র কাবাঘর ও রাসূল (সা.)-এর রওজা মোবারক। প্রিয়নবী (সা.) এ দুই স্থানের সুস্পষ্ট মর্যাদা ঘোষণা করেছেন। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেন, নিশ্চয়ই আসমান জমিন সৃষ্টির দিনই আল্লাহ এ জমিনকে (মক্কা নগরীকে) হারাম বা সম্মানিত করেছেন। সুতরাং কিয়ামত পর্যন্ত তা হারাম ও সম্মানিত থাকবে।’ [মুসলিম]।

অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনার মর্যাদা ঘোষণা করেন বলেন, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শুধু তিনটি মসজিদের উদ্দেশে সফর করা যাবেÑ আমার মসজিদ (মসজিদে নববী)-(মক্কার) মসজিদে হারাম এবং মসজিদে আকসা (জেরুসালেম)।’ [মুসলিম]।

তাছাড়া হাদিসে মসজিদুল হারামাইনে সালাত আদায় করা অন্য যে কোনো স্থানে সালাত আদায়ের চেয়ে উত্তম বলা হয়েছে। হজরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমার এই মসজিদে নামায আদায় অন্য মসজিদের হাজার নামাযের চেয়েও উত্তম। তবে (মক্কার) মসজিদে হারাম ছাড়া। কেননা (মক্কার) মসজিদে হারামে একটি নামায অন্য মসজিদের এক লাখ নামাযের চেয়ে উত্তম।’ [মুসনাদে আহমদ]।

অন্য হাদিসে এরশাদ হয়েছে, আবদুল্লাহ বিন উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, আমি রাসূল (সা.)কে বলতে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করল এবং দুই রাকাত নামায পড়ল, তা একটি ক্রীতদাসকে দাসত্বমুক্ত করার সমতুল্য।’ [ইবনে মাজাহ : ২৯৫৬]।

অপর হাদিসে তাওয়াফকারীর প্রতিটি কদমে কদমে গুনাহ মাফ ও সাওয়াব লেখার কথা বলা হয়েছে। উমাইর (রহ.) থেকে বর্ণিত, ভিড় ঠেলে হলেও ইবনে উমর (রা.) হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানির কাছে যেতেন (তা স্পর্শ করার জন্য)। রাসূল (সা.)-এর অন্য কোনো সাহাবীকে আমি এরূপ করতে দেখি নাই। আমি বললাম, হে আবু আব্দুর রহমান! আপনি ভিড় ঠেলে হলেও এই দুই রুকনে গিয়ে পৌঁছেন, কিন্তু আমি তো ভিড় ঠেলে রাসূল (সা.)-এর অন্য কোনো সাহাবীকে সেখানে যেতে দেখিনি। তিনি বলেন, আমি এরূপ কেন করব না? রাসূল (সা.)-কে আমি বলতে শুনেছি, এ দুটি রুকন স্পর্শ করলে গুনাহসমূহের কাফফারা হয়ে যায়। [তালিকুল রাগিব : ২/১২০]।

উপরে বর্ণিত কুরআনের আয়াত ও হাদিস থেকে বোঝা যায়, পবিত্র মক্কা ও মদিনা দুনিয়ার সবচেয়ে মর্যাদা ও সম্মানের স্থান। শুধু তাই নয়, আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের উত্তম সুযোগ সেখানে রয়েছে। আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ১৯৭৪ সালে প্রথমবার পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব গমন করেন। এরপর ১৯৭৬ সাল থেকে তিনি গ্রেফতারের পূর্ব পর্যন্ত নিজের আত্মিক উন্নয়ন ও রূহানি শক্তি বৃদ্ধির জন্য প্রায় প্রতি বছর হজ পালন করেছেন। একই লক্ষ্যে প্রতি রমজান মাসে ওমরাহ পালন শেষে হেরেমের অভ্যন্তরে ইতিকাফ করেছেন। এজন্য তিনি কারাবন্দি জীবনেও মক্কা-মদিনা যাওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করতেন।

সেদিন আমি ওনার দ্বিতীয় আকাক্সক্ষা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা ভালোই জানেন জালিমের এ বন্দিশালা থেকে মুক্ত হতে পারবো কিনা? তাঁর রহমত ও সাহায্যের বদৌলতে যদি মুক্তি লাভ করি, তাহলে পুনরায় কুরআনের ময়দানে ফিরে যাবো এবং জীবনের বাকি সময় মানুষের মাঝে দীনের দাওয়াত প্রচার ও প্রসারের জন্য কাজ করবো। অতঃপর তিনি আমার কাছে দোয়া কামনা করেন, যেন আল্লাহ তায়ালা ওনার এ দুটি আশা পূরণ করেন। আমি বললাম, আপনার জন্য দেশে-বিদেশে অসংখ্য মানুষ দোয়া করছেন। অনেকেই কা’বাঘরের গিলাফ ধরে কান্না-কাটি করে আপনিসহ ইসলামী আন্দোলনের সকল মজলুম নেতৃবৃন্দের জন্যও প্রতিনিয়ত দোয়া করে থাকেন। এ কথা শোনার পর তিনি “আমিন” বলে চোখের পানি মুছতে থাকেন। ঐ সময়ে জালিম সরকারের বন্দিশালা থেকে মুক্তি লাভ এবং ওনার সেই আকাক্সক্ষা পূরণ হতে না দিলেও আমাদের দৃঢ় বিশ^াস তিনি আল্লাহর পথে শাহাদাত বরণ করে মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে আরো উত্তম মর্যাদা লাভ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তাকে (শহীদকে) বলা হলো, জান্নাতে প্রবেশ কর। সে বলবে-হায়! আমার বংশধরগণ যদি জানতে পারত আমার পরওয়ারদিগার কীসের বিনিময়ে আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং আমাকে মর্যাদাসম্পন্ন লোকদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।” [সূরা ইয়াসীন : ২৬-২৭]।

পুরাতন ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের ২৬নং সেলের পশ্চিম কোণে একটি খালি জায়গা আছে, যেখানে ভিআইপি বন্দিদের সেবক (সাজাপ্রাপ্ত আসামি) বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষাবাদ করতো। জেলের প্রথমদিন বিকালবেলা হাটার সময় আমি তাদেরকে টমেটোর চারা রোপণ করতে দেখেছি। এ টমেটো বাগানের তারা পরিচর্যা করে বন্দিজীবনের বেদনা ও মানসিক চাপ লাঘব করার চেষ্টা করত। জেলখানা থেকে আমার জামিনে মুক্তি লাভের দিন বিকালে আল্লামা সাঈদীর সাথে প্রতিদিনের মতো হাঁটতে বের হলাম। হাঁটতে হাঁটতে তিনি অনেক গল্প করলেন। প্রায় সময় তিনি মনের আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করে যে কথাগুলো আমাকে বলতেন, সেদিনও তা পুনরাবৃত্তি করলেন। কথা বলতে বলতে এক চক্কর শেষ হয়ে যায়। দ্বিতীয় চক্কর শুরুর সময় হুজুরকে বললাম, আমি যেদিন জেলখানায় আসি, সেদিন সেবকদের এ টমেটোর চারাগুলো রোপণ করতে দেখেছি। আজ দেখছি টমেটোগুলো লাল রং ধারণ করেছে। মনে হয় পেকে গেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে তিনি মুচকি হেসে বলেই ফেললেন, মনে হয় আপনার চলে যাওয়ারও সময় হয়েছে। এই কথা বলার দুই থেকে তিন মিনিটের মধ্যে গেট দিয়ে একজন লোক ফাইল হাতে নিয়ে প্রবেশ করলো। সে আমাকে সালাম দিয়ে বললো, স্যার আপনাকে দ্রুত রেডি হতে হবে। কারণ সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আমি বললাম, সন্ধ্যা হয়েছে তাতে কী অসুবিধা? সে বললো- আপনার জামিন হয়েছে। এ কথা শুনে আমি কিছুটা বিস্মিত হলাম! কারণ এর পূর্বে এ ধরনের এক লোকের মাধ্যমে আমাকে অফিসে ডেকে নিয়ে মিন্টুু রোডের ডিবি অফিসে চারদিন রিমান্ডে রাখা হয়েছিল। রিমান্ডে ডিবি পুলিশ কী আচরণ করে, তা কারো অজানা নয়। এ ঘটনা পুনরায় হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে আমার মনের ভেতরে আশঙ্কা কাজ করছিল। লোকটি আমার চেহারার দিকে তাকিয়ে আবার বললো, স্যার আসলেই আপনার জামিন হয়েছে। এ খবর শুনে উপস্থিত সকলে আনন্দিত হলেও আমি মনের ভেতর কোনো কিছু হারানোর বেদনা অনুভব করলাম। সুন্দর এ পরিবেশ ত্যাগ করে চলে যেতে হবে বলে কষ্ট হচ্ছিল। এমতাবস্থায় আমি কক্ষে এসে জামাকাপড় পরিবর্তন করছিলাম। সেবকরা আমার মালামাল ও ব্যাগ গোছাচ্ছিল। এ সময় আমাদের দুই রাহবার মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী এবং আল্লামা সাঈদীসহ আরো কয়েকজন ভিআইপি বন্দি আমার কক্ষে প্রবেশ করেন। সেবকদের সাথে ওনারা নিঃসংকোচে আমাকে প্রস্তুত করে দিয়ে প্রথমে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী এরপর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেব আমার কপালে চুমু খেয়ে আমার জন্য দোয়া করে বিদায় জানান। আমিও আমার ওপর আল্লাহর দীনি আন্দোলনের পক্ষ থেকে অর্পিত জিম্মাদারি যেন সঠিকভাবে পালন করতে পারি, সেজন্য ওনাদের কাছে দোয়া কামনা করলাম।

অতঃপর একে একে সেখানকার সকল বন্দির কাছ থেকে বিদায় নিলাম। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বিদায় নিয়ে জেলখানা থেকে বের হওয়ার উদ্দেশে কারা অফিসে রওয়ানা দেই। একটু পরে জেলগেটের কাছে অবস্থিত ডেপুটি জেলারের কক্ষে পৌঁছে দেখি আব্দুর রহমান মূসা ভাই সেখানে বসা। (বর্তমানে তিনি কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের ভারপ্রাপ্ত আমীর)। উনিও আমার সাথে একই মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন। ২০১২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তিনিও একই দিন জামিনে মুক্তি লাভ করেন। তখন মাগরিবের আজান শুনে আমরা এ অফিসে জামায়াতের সাথে সালাত আদায় করলাম। অনেকক্ষণ বসে থেকে অপেক্ষার পর ডেপুটি জেলারকে জিজ্ঞেস করলাম, আমাদের জেলখানা থেকে মুক্ত হতে আর কত সময় লাগবে? জবাবে তিনি অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে ফরমালিটি শেষ হয়ে যাবে বলে জানালেন। এর মধ্যে এশার আজান হলে আমরা জামায়াতের সাথে সেখানে সালাত আদায় করলাম। এরপর জামিন লাভের পরও আমাদের ছাড়তে বিলম্ব কেনÑ জানতে চাইলে ডেপুটি জেলার বললেন, স্যার আপনার সঙ্গী (মূসা ভাই) চলে যেতে পারেন। ওনার অফিসিয়াল ফরমালিটি শেষ হয়েছে। আপনার একটু বাকি আছে। আমি মূসা ভাইকে বললাম, আমার মনে হয় দেরি হবে আপনি চলে যান। আপনি অসুস্থ মানুষ রাত হলে কষ্ট হবে। উনি আমাকে একা রেখে যেতে নারাজ। শেষ পর্যন্ত আমার জন্য অপেক্ষা করলেন। এর মধ্যে সংবাদ পেলাম কারা ফটকের সামনের চত্বরে ঢাকা মহানগরীর নেতৃবৃন্দসহ সংগঠনের অনেক ভাই আমাদের রিসিভ করার জন্য অপেক্ষা করছেন। রাত ৯টার পর ডেপুটি জেলার জানালেন, আপনি একজন মাননীয় সংসদ সদস্য, মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ক্লিয়ারেন্স ছাড়া আপনাকে না ছাড়ার নির্দেশনা আছে। আমি বললাম, আমাকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত জামিন দিয়েছেন। সুতরাং আমাকে আটকে রাখার কোনো এখতিয়ার কোনো মন্ত্রী ও সরকারের নেই। আপনারা আইন অনুযায়ী কাজ করুন। তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বললেন, স্যার এটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ। আমার কিছু করার নেই। আমি বললাম, এটিই কি স্বাধীন দেশে আইনের শাসন? এরপর আমরা আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি। তাছাড়া কোনো উপায় নেই। এর মধ্যে নানা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল যে, ফ্যাসিবাদী সরকার আমাকে পুনরায় গ্রেফতার করে নিয়ে যেতে পারে। এ ধরনের ঘটনা তখন প্রায় ঘটছিল। একটু পর ডেপুটি জেলার এসে বললেন, স্যার আপনাকে ছাড়ার ব্যাপারে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ক্লিয়ারেন্স আছে এবং মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও কোনো আপত্তি করেননি। আশা করি, আপনি মুক্তি পাবেন কোনো সমস্যা হবে না। আমি বললাম, তাহলে দেরি কেন, কী সমস্যা? জবাবে তিনি বললেন, মন্ত্রী মহোদয় এ বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলাপ করে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করবেন। ঐ কর্মকর্তা আরো জানালেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে বঙ্গভবনে ব্যস্ত আছেন। একটু পরে আমরা জানতে পারব।

আনুমানিক রাত ১০টায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত এলে আমরা জেলখানার অফিসে যারা ছিলেন, তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মূল কারাফটক দিয়ে বেরিয়ে আসি। বের হয়ে দেখি, সেখানে হাজার হাজার লোক। ঢাকা মহানগরী কর্মপরিষদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম ভূইয়াসহ নেতৃবৃন্দ এগিয়ে এসে ফুলেল শুভেচ্ছা জানালেন। অতঃপর কয়েকজনকে সাথে নিয়ে গাড়িতে করে বাসায় যাওয়ার উদ্দেশে রওনা হই। পথিমধ্যে একজন অফিসার জানতে চান, আমি কি বাসায় না দলীয় অফিসে যাব? অনেক রাত হওয়ায় সবাই পরামর্শ করে বাসায় যাওয়ার কথা তাকে জানিয়ে দিই। কারা জীবনের আড়াই মাস অতিবাহিত হওয়ার পর রাত প্রায় ১২টায় আমার রামপুরা বনশ্রী সংলগ্ন বাসায় গিয়ে পৌঁছি। বন্দিজীবনের অবসান হওয়ায় আমার স্ত্রী, সন্তানসহ, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশী সকলের উদ্বিগ্নতা কেটে যায়। পরদিন সকাল থেকে সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীগণ বাসায় দেখা করতে আসেন। সাংগঠনিক কার্যক্রম ও জরুরি বৈঠকসমূহে বাসাকেন্দ্রিক চলতে থাকে। কারণ ঐ সময় আমাদের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগরী অফিসসহ সারা দেশের অফিসগুলো পুলিশ বন্ধ করে দিয়েছিল। বাসায় দু-তিন দিন থাকার পর দেখি, আমার মসজিদে নামায পড়তে যাওয়া, স্বাভাবিক চলাফেরা ও বাসায় অবস্থানের ওপর নজরদারির জন্য সরকার লোক নিযুক্ত করেছে। গোয়েন্দা সংস্থার যে লোকটি ইতঃপূর্বে আমার নজরদারির জন্য মহানগরী অফিসে নিযুক্ত ছিল, তাকে বাসার সামনে ঘোরাফেরা করতে দেখে আমি বিষয়টি নিশ্চিত হলাম। তখন বাধ্য হয়ে নিজের বাড়ি ছেড়ে আমরা সপরিবারে সিদ্ধেশ^রীতে চলে যাই। সেখানে এক মাস থাকার পর একই ঘটনা ঘটল। সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার লোক পরিচয় দিয়ে একজন আমার ব্যক্তিগত সহকারীকে সেল ফোনে আমার বাসার ঠিকানা জানতে চান। কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তাকে সরকারের পক্ষ থেকে আমার খোঁজখবর রাখার জন্য নিযুক্ত করা হয়েছে বলে জানান। এরপর বার বার বিরক্ত করলে তার সাথে আমি নিজে কথা বলি। তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে সে একদিন আমার ব্যক্তিগত সহকারীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নতুন বাসায় চলে আসে। তখন বাসায় থাকা নিরাপদ মনে না হওয়ায় সংগঠনের দায়িত্বশীলদের সাথে পরামর্শ করে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্যত্র বসবাস শুরু করি, যা এখনো অব্যাহত আছে। এভাবে ১২ বছর চলে গেল। আল্লাহ তায়ালা ভালো জানেন, এ জুলুমের শেষ কোথায়? আমাদের অসংখ্য নেতা-কর্মী ছোট্ট কারাগারে বন্দি। আর যারা বাহিরে আছে, তারা যেন বড় কারাগারে বন্দি হয়ে দিনাতিপাত করছি। ভাবতে কষ্ট হয় একটি স্বাধীন দেশ হয়েও গোটা বাংলাদেশ যেন এক যুগের বেশি সময় ধরে গণকারাগারে পরিণত হয়েছে।

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জন্য জেল-জুলুম স্বাভাবিক বিষয়। সেটি কারাগারের অভ্যন্তরে হোক বা কারাগারের বাইরে জুলুম-অত্যাচার হোক। তাই হাদিসে মুমিনের জন্য দুনিয়াকে কারাগার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) এরশাদ করেছেন, দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফির ব্যক্তির জন্য জান্নাতের সমতুল্য। [মুসলিম: ২৯৫৬]।

হাদিসটির ব্যাখ্যায় শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেছেন, মৃত্যুর পর মুমিনকে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে অফুরন্ত নিয়ামতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেই তুলনায় দুনিয়া তার কাছে কারাগারের মতো। অন্যদিকে মৃত্যুর পর কাফিরের জন্য আল্লাহর যে আজাবের প্রতিশ্রুতি রয়েছে, সেই তুলনায় দুনিয়া তার কাছে জান্নাতের মতো। অর্থাৎ পরকালের অফুরন্ত সুখ বা দুঃখের বিবেচনায় দুনিয়ার জীবন মানুষের জন্য কারাগার বা জান্নাত হবে। [জামিউর রাসাইল: ২৬১/২]। (চলবে…)